ধানুয়া টোটোর কথামালা । ধনীরাম টোটো । প্রচ্ছদ
ধানুয়া টোটোর কথামালা লেখক ধনীরাম টোটো প্রকাশক অন্যতর পাঠ ও চর্চা প্রকাশিত ২০২২

জন্মসূত্রে ব্রিটিশ, বিশিষ্ট ভারতীয় নৃতত্ত্ববিদ ভেরিয়ার এলউইন আদিবাসীদের উপর তাঁর দীর্ঘদিনের কাজের অভিজ্ঞতার সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির নির্যাস হিসেবে কিছু নীতিকে সূত্রায়িত করেছিলেন। তার কয়েকটি হল,আদিবাসীদের তাদের নিজস্ব প্রজ্ঞার পথে বিকশিত হতে হবে এবং তাদের উপর কোন কিছু চাপিয়ে দেওয়া থেকে আমাদের বিরত থাকতে হবে। তাদের পরম্পরাগত শিল্প ও সংস্কৃতিকে সব রকম ভাবে উৎসাহিত করার চেষ্টা করা উচিত। জমি ও জঙ্গলের উপর আদিবাসী জনজাতির অধিকারকে সম্মান করতে হবে এবং আদিবাসী জনজাতিদের এলাকায় খুব বেশি বাইরের লোককে ঢোকানো আমাদের এড়াতে হবে। তাদের নিজেদের মধ্যে থেকেই একটা দলকে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে গড়ে তুলতে হবে প্রশাসন ও উন্নয়নের কাজ করার জন্য। ওই সমস্ত এলাকায় বাড়াবাড়ি রকমের প্রশাসন চাপানো উচিত নয় বা পরিকল্পনার বহুত্বে আচ্ছন্ন করে দেয়া উচিত নয়। নেহেরু বলেছিলেন যে কেবল নেফা-য় নয় ,গোটা ভারত জুড়ে আদিবাসী উপজাতিদের সঙ্গে সরকারের সম্পর্ক স্থাপনের নীতি হবে এটি। এলউইন বলেছিলেন, কে প্রকৃত পশ্চাদবর্তী- পাহাড়ের মধ্যে সারল্য ও সত্য নিয়ে কর্মরত সৎ চাষি, না কি ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য উন্মত্ত দৌড়বাজিতে নিমগ্ন আধুনিক প্রগতির প্রতিনিধি, যে প্রগতির কৃতিত্বের নিদর্শন হল হাইড্রোজেন বোমা?

এলউইনের এই দৃষ্টিভঙ্গি বিচ্ছিন্ন একক নয়। তাঁর পূর্ববর্তী ঔপনিবেশিক শাসনাধীন ভারতের দুই প্রধান চিন্তক রবীন্দ্রনাথ ও মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর সমাজচিন্তার মধ্যেও এর পূর্বসূত্র আমরা খুঁজে পাই।বলাবাহুল্য নেফায় চীনের অনুপ্রবেশ এবং চীন ভারত যুদ্ধের পর খড়কুটোর মতো ভেসে গেল নেফা তথা বাকি ভারতের জন্য এই দর্শন। ভারত জুড়েই আদিবাসী জনজাতিদের উপরেই একমাত্রিক ভারতীয়করণের উদ্দেশ্যে আক্রমণ চলছে। আদিবাসীদের নিজস্ব ভাষা সংস্কৃতি সমাজের গঠনকে ধ্বংস করে তাদের মূলধারায় নিয়ে আসার জন্য। এলউইনের সুচিন্তিত সব মতামতগুলিকে অগ্রাহ্য করা হয়েছে। প্রকাশক ও সম্পাদক বিপ্লব নায়কের ভূমিকা থেকে এটুকু উপক্রমণিকা দিয়েই আমরা ধনীরাম টোটোর লেখা ‘ধানুয়া টোটোর কথামালা’ উপন্যাসে প্রবেশ করতে পারি। উত্তরবঙ্গের ক্ষুদ্রতম এক জনজাতির প্রতিনিধি ধনীরামের এই লেখাটি টোটোদের মধ্যে লেখা প্রথম উপন্যাস। টোটো লিপিরও জনক ধনীরাম স্বয়ং। প্রথম বলেই উপন্যাসটির সাহিত্যমূল্যের বাইরেও ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম। সামাজিক রীতি প্রথার আলোচনা, ধর্মীয় গানের ধারা, টোটোপাড়ার নিজস্ব ইতিহাস, ভূগোল, প্রাকৃতিক দৃশ্য, সামাজিক অবক্ষয় ,জমি হারানো টোটোদের বাস্তব কাহিনী -এই নিয়েই 'ধানুয়া টোটোর কথামালা' উপন্যাসের শরীরী অবয়ব গড়ে উঠেছে।

টোটোদের বিষয়ে এযাবৎ বহু তথ্য সমৃদ্ধ গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো যারা করেছেন, তাঁরা প্রত্যেকেই টোটো সমাজের বাইরের লোক। ১৮৮৯- সান্ডার্স দ্বারা পরিচালিত জমি জরিপে টোটোদের কথা জানা যায়। বিশিষ্ট নৃতাত্ত্বিক চারুচন্দ্র সান্যাল, অধ্যাপক ও নৃতাত্ত্বিক বিমলেন্দু মজুমদার, সুধীর কুমার বিষ্ণু পরবর্তীতে তথ্য সংযোজন করেছেন। ধনীরাম তাঁর উপন্যাসে টোটোদের বিষয়ে এই সমস্ত রকম তথ্য পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যুক্ত করেছেন। ১৮৬৪-৬৫ সালের ডুয়ার্স যুদ্ধের মধ্য দিয়ে টোটোপাড়া সহ ডুয়ার্সের বিস্তীর্ণ অঞ্চল ব্রিটিশদের অধীনে আসে। তার আগে অব্দি এই অঞ্চল ছিল ভুটানের অধীন। ভুটানের সামন্ত প্রভুরা প্রায়ই সশস্ত্র অভিযান চালিয়ে খাজনা লুট করে নিয়ে যেত এই অঞ্চল থেকে। টোটোরা ছিল ভুটিয়া প্রভুদের বেগার খাটিয়ে। ভুটিয়াদের জংখা ভাষায় এদের বলা হত জাপো। যার বাংলা প্রতিশব্দ দাসপ্রজা। এই ভার বহন ব্যবস্থাকে জংখা ভাষায় বলা হত হুইইয়া, অর্থাৎ বেগার শ্রম দান।

এই বেগার খাটার পাশাপাশি তাদের গোষ্ঠীগত মালিকানাধীন কৃষিজমিতে জুম চাষের মাধ্যমে কাউন বা সামা খাদ্যশস্য উৎপাদন করত। টোটোপাড়া প্রচুর কমলালেবুর গাছ ছিল। সেই গাছের কমলালেবু বাজারে বহন করে নিয়ে তারা কিছু উপার্জন করতো বা বিনিময় প্রথায় কিছু ব্যবহার্য বস্তু সংগ্রহ করত। এরই নাম ছিল আংদাইওয়া। টোটোরা প্রকৃতির উপাসক। দুটি ঢোল তাদের দেবতা। একটার নাম চিগাইসু অন্যটির নাম মুগাইসু। উপাসনা স্থলের অন্য কোন মূর্তি বা দেবতার নেই। বাৎসরিক পূজার তিন দিন এই দুটোকে নামিয়ে নিরাকার সাংজা দেবতার নামে বাজানো হয়। ১৮৬৬ সালে ব্রিটিশ আধিপত্যে আসার পর টোটোরা বেগার খাটা প্রথা থেকে মুক্তি পায়। টোটো পাড়া অঞ্চলে প্রচুর পরিমাণে কমলালেবু চাষ বাড়তে থাকে। সেই কমলা লেবু বিক্রি করে অর্থ ও নানা পণ্য সংগ্রহের অভ্যাস গড়ে ওঠে। একে তারা বলত পিচকো হওয়ার। ১৯৩১ সালে অজানা রোগের মোড়কে কমলা লেবুর চাষ টোটোপাড়া থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। লোকশ্রুতি তৈরি হয়- মেচ জনজাতির অভিশাপই এর কারণ। কিন্তু ধনীরাম বলেন, বন জঙ্গল কেটে কমলা লেবুর গাছ লাগানোর অতিরিক্ত প্রবণতা ধীরে ধীরে আলগা করে দিয়েছিল উপরের উর্বর মাটি স্তরকে। বর্ষার জলে ধুয়ে তা নেমে গেছে পাহাড়ের গা বেয়ে। পড়ে থাকা অনুর্বর মাটি অযোগ্য ছিল কমলা লেবু চাষের জন্য। এই ধাক্কা টোটোদের জীবন-জীবিকাকে ওলট-পালট করে দেয়। জীবনকে বস্তুগত ভাবে উন্নত করে তোলার উপার্জনের পথ ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় তারা চরম দারিদ্র্যের মধ্যে পতিত হয়। দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন সাধারণ পরিস্থিতি এই সংকটকে আরো তীব্র করে। অস্থায়ী শ্রমিক হিসেবে ফের তারা ভুটানে যেতে থাকে। ১৯৭০ - এর সময়কাল অবধি বাঁশ ছিল বাড়ি থেকে রান্নার পাত্র নির্মাণের সামগ্রী। বছর কুড়ি বিক্রি করার পর সেই বাঁশও টোটোপাড়া থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।
বিভূতিভূষণের 'আরণ্যক' যেমন শহর থেকে আসা এক মানুষের চোখের সামনে অনাবিষ্কৃত এক আদিম অরণ্য জগতের উন্মোচন ও তার সঙ্গে একাত্মতা, এখানে তার উল্টো।  উপন্যাসের প্রোটাগনিস্ট ধানুয়া সেই আদিম জনজাতীর অংশ যে অরণ্য সভ্যতার প্রতিভূ। ধানুয়ার অরণ্যকে দেখার দৃষ্টিকোণটি তাই সম্পূর্ণ আলাদা। যে উপভোগের দৃষ্টিতে আমরা জঙ্গল নদী পর্বতকে দেখি ধানুয়ার দৃষ্টিভঙ্গি তার সম্পূর্ণ বিপ্রতীপে অবস্থিত।

১৯৭২ সাল থেকে কাহিনীর সূত্রপাত। শিরোনাম- ধানুয়ার প্রথম মাদারীহাট যাত্রা। মনে পড়বে বিভূতিভূষণের পথের পাঁচালী উপন্যাসে বাবা হরিহরের সঙ্গে অপুর প্রথমবার গ্রামের বাইরে যাওয়ার অভিজ্ঞতা। ধানুয়া টোটো তার দিদিমা সুনকরী টোটোকে বলছে রবিবারের মাদারিহাটের হাটে নিয়ে যেতে। ধানুয়ার বাবা পঞ্চায়েত মুখিয়া। টোটোপাড়া থেকে মাদারিহাটের পথ একের পর এক নদীখাত পাহাড় ডিঙিয়ে তেইশ কিলোমিটার বন-জঙ্গল পেরিয়ে। দু'পাশে জঙ্গল, পাখি, বনের হরিণ। না, সেই বাহাত্তরের কাহিনী থেকে এখনো তাদের গ্রামে পৌঁছবার জন্য উন্নয়নের মসৃণ পথ পৌঁছয় নি।

এই প্রথম যাত্রাপথেই ট্রেন দেখার বিস্ময় আছে। পাঠকের মনে পড়ে যাবে অপুর রেলগাড়ি দেখার কথা। কিন্তু অপু দুর্গার কাছে এই ট্রেন কোন ভীতিজনক বিষয় ছিল না। সেখানে কথকের মনে সভ্যতার চাকার প্রতি স্বভাবতই কৌতুহল, মুগ্ধতা ছিল। কিন্তু বনবাসী আদিবাসীদের প্রতিভূ ধানুয়া টোটোর মনে হয়েছে এই অগ্রগতি তাদের ধ্বংস করেছে। ট্রেন তার কাছে কোন সুদূরের কল্পনা নয়। ক্রমাগত প্রযুক্তির উন্নয়ন ও তার নির্বিচার প্রয়োগ তাদের প্রাচীনকালের বাসস্থান অরণ্য ধ্বংস করেছে। তাদের বিশ্বাসের পর্বত খুঁড়ে খনিজ তুলে এনেছে, নদী দেবতার বুকে বাঁধ তুলেছে। তাঁর প্রথম ট্রেন দেখার অভিজ্ঞতা এমনই- ' আওয়াজ টা বাড়তে বাড়তে হঠাৎ দূরে রেললাইনের উপর দেখা দিল একটা থ্যাবড়া মুখ। সব কল্পনাকে হার মানায় এমন বিশাল এক ভোঁতামুখো লোহার সাপ যেন বীভৎস গর্জন করতে করতে তীর বেগে ছুটে আসছে। তার বিষ- নিঃশ্বাস কালো ধোঁয়া হয়ে ভোস ভোস আকাশের দিকে ছুটে যাচ্ছে। শিশু ধানুয়ার কৌতুহলের উত্তরে তার পঞ্চায়েত মুখিয়া বাবা বলেন, 'ট্রেন গাড়ি বাবুদের নিয়ে ওই দূরে দূরে ছোটে"। দার্জিলিং কাশ্মীরের মতো দূরে দূরে ধান্দা করতে করতে যায় তারা।

বাবার কথায় তার মনে হয়, শহরের জঙ্গলের বাঘ ভাল্লুকরা কি অনেক বেশি মানুষ খেকো? ধানুয়ার বাবা বলেন, জঙ্গল কেটে সাফ করে দিয়েছে শহরের মানুষরা। ধানুয়ার মনে হয়, " জঙ্গল সাফ হয়ে গেলে পড়ে থাকবেটা কী? "দুর্ভাগ্যক্রমে আমরা দেখি সরকারি অনুমতি নেওয়ার পর এই টোটোপাড়া থেকেই টোটোদের একসময়কার প্রয়োজনীয় বাঁশের বন স্থানীয়রাই বিক্রি করে দেয়।

১৯৬০ সালে চারুচন্দ্র সান্যাল লিখছেন,' টোটোদের ভাষা চর্চা করবে এবং তাদের নিজেদের ভাষায় তাদের প্রাথমিক পাঠ দেবে এমন কেউ নেই" প্রাথমিক স্কুলে প্রবেশের পর ঠিক এই সমস্যাটির মুখোমুখি হয় ধানুয়া। জমির অধিকার সংক্রান্ত ক্ষেত্রেও যেমন বিদ্যালয়েও টোটোদের মূল সমস্যা নিজেদের ভাষার বাইরে বাংলা মাধ্যমের শিক্ষা ব্যবস্থা। না বুঝেই সরকারি কাগজে সই করে দিতে বাধ্য হয় তারা। ধানুয়ার বাবা আমেপা টোটোর কথায়- 'আমাদের কথা কী তারা বুঝল আর কী লিখল তা আমরা বুঝবো কীভাবে? আমাদের টোটো ভাষাও তো ওই বাবুরা কিছুই বোঝেনা। যদি তারা কিছু ভুল বোঝে বা ভুল লেখে তাহলে কলকাতার সরকারের কাছে তো ওই ভুলটাই ঠিক হয়ে যাবে আর আমাদেরও পরে সেই ভুলকে ঠিক বলে মানতে বলবে।"

উত্তরপূর্বে দীর্ঘদিন ধরে জনজাতিদের ওপর বাংলার যে ভাষা আগ্রাসন ছিল তাকে আমরা দেখেও দেখিনি। লেখক লিখছেন বাবুরা তাদের নিজেদের ভাষার তুলনায় আমাদের ভাষাকে অনেক ছোট করে দেখে। ‘আমাদের যেমন বুনো জংলি বলে গাল দেয়, আমাদের ভাষাকেও গাল দেয়" স্কুলে গিয়ে বাংলা ভাষা বুঝতে না পারার অপরাধে শিক্ষকরা ধানুয়া কে প্রহার করে, নির্বোধ আখ্যা দেয়। আকারে-ইঙ্গিতে বলে যে ধানুয়ার স্থান স্কুলে নয়, জঙ্গলে। ধানুয়া এই সহানুভূতি হীন স্কুল ছেড়ে দেয় বটে কিন্তু মনের মধ্যে কথাগুলি থেকে যায়, টোটোদের বাপ-মা ঠাকুরদা ঠাকুরমাদের মুখে শোনা মৌখিক অতীত কথা, ভগবান সেংজার কথা, হিসপা পুদুয়া পাহাড়ের কথা, জঙ্গল সংগ্রহ আর চাষের কথা, আরো কত গান ছড়া কি পাঠ্য বিষয় নয়?" পরিণত বয়সে ধানুয়া টোটোর প্রতিবাদী সত্তা ব্যঙ্গে ঝলসে ওঠে,’বাবুরা বলেছেন আমাদের ইংরেজি ভাষায় পড়াশুনো করে উন্নতি করার ব্যবস্থা করবেন, টোটো ভাষা থাকবে কেবলই বাবুদের বেঁধে দেওয়া মঞ্চে নাচ গান নাটক করার জন্য"

প্রথমেই লিখেছিলাম উপন্যাসিক টোটো জীবনের প্রতিটি দিক ছুঁয়ে গেছেন। যেমন আসছে তাঁদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ ভেষজ বিদ্যার কথা।অরণ্যের আদি বাসিন্দারা সারা পৃথিবী জুড়েই ভেষজ বিদ্যার দড়। বংশ পরম্পরায় অরণ্য তাদের ধাত্রী। "দিদিমা ই তাকে জঙ্গলে ঘুরে ধরে ধরে চিনিয়েছে কোন লতা- শাক- ফল খাওয়ার জন্য সংগ্রহ করা যায়, শিখিয়েছে কীভাবে উপর থেকে মাটির চেহারা দেখে বোঝা যায় যে তার নিচে ভালো কন্দ আছে"

ধানুয়া তাই দিনের অরণ্যে খোঁজে চুরুসাই ও মুরুংসাই লতা, দুদরুমসাই নামে লালচে লোভনীয় ছত্রাক, বাবার প্রিয় খাবার কেরসাই পাতা। ঝুড়ি ভরে ওঠে দিদিমার ঔষধিতে, শাক ফল কন্দে আর শুয়োরের খাদ্যে। আছে ডয়ামারা গুহার কথা। ধানুয়ার কাছে গুহার শিলীভূত পাথর প্রকৃতির সৌন্দর্য মাত্র নয়, অপূর্ব উপমায়,' সেই ছাদ জুড়ে পাথর আকৃতি নিয়েছে সার সার গরুর বাটের মতো, যার মুখ দিয়ে জল চলে আসে খুব ধীরে ' ধানুয়ার মনে পড়ে যুগ যুগ ধরে তার মত কত টোটো এখানে এসে বিশ্রাম নিয়েছে। তাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ এই গুহায় চলত প্রেম পরিণয়ের লীলাখেলা।

টোটোভূমির অপরূপ এই আখ্যানে, জাপেনদের কথা এসেছে। বাঙালি বিহারী নেপালি যারা টোটোপাড়ার বাইরে থেকে এসেছে তাদের বলে জাপেন। তাদের আগমনের কারণ বহুবিচিত্র। শোনা যায় ভারতের কেন্দ্রীয় সংসদের সংসদ দাবি তুলেছিল, চিন ভারত যুদ্ধের সময় অরুণাচল প্রদেশে পঞ্চাশহাজার পাঞ্জাবি কৃষককে নিয়ে গিয়ে জমি-বাড়ি সরকারি সাহায্য দিয়ে সেখানে থিতু করিয়ে দেওয়ার। এর মধ্যে দিয়ে নাকি সেখানকার অর্থনীতি ও দ্রুত সমৃদ্ধ হবে ,দেশের শত্রুরা আক্রমণ করলে তাদের জবাব দেয়ার শক্তিও মজবুত হবে। টোটোদের বাসভূমিতেও এভাবেই নেপালিদের, ওপার বাংলা থেকে আসা বাঙালি উদ্বাস্তুদের বসানো হয়েছে। জাপেনদের পাশে যখন দাঁড়ায় রাজনৈতিক দল এবং স্বয়ং রাষ্ট্র তখন অসহায় ভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া ছাড়া টোটোদের আর কিছুই করার থাকেনা।" বাংলাদেশ থেকে আসা জাপেনরা লাল ঝান্ডা ধরে পার্টিগিরির আমদানি করল। নেপালি জাপেনরাও হল লাল ঝাণ্ডাধারী" সাম্যবাদের শ্রেণিসংগ্রামও শেষ অব্দি প্রান্তিকের প্রান্তিক মানুষের অধরা থেকে যায় ।"ধানুয়ার মা বলেছে, ধানুয়া কে এর প্রতিকারের পথ করতে হবে। জমি জঙ্গলের উপর টোটোজাতির হারানো অধিকার ফিরিয়ে এনে টোটো জাতির কষ্ট দূর করতে হবে" আর অন্যদিকে " ধানুয়ার স্থির প্রত্যয় যে একদিন তার স্বপ্ন সফল হবে, টোটো জাতি তাদের মাতৃভূমি ফিরে পাবে, জমিও জঙ্গলের আশীর্বাদে সবার জীবন আবার ভরে উঠবে' অরণ্য বিষয়ে ধানুয়ার বাস্তবতা আর আমাদের বাস্তবতায় বিরাট তফাৎ।  ধানুয়া সবলে উন্নয়নকে প্রত্যাখ্যান করেছে, "এখন আমাদের ঘরটাকেও জলাঞ্জলি দেব পর্যটক বাবুদের জন্য হোমস্টে করে তাঁদের খানাপিনা ফুর্তির আয়োজন করার মধ্য দিয়ে? "

ধানুয়া বাইরের পৃথিবী বিষয়ে সম্যক অবহিত। ঔপন্যাসিকের তির্যক বোধের প্রকাশ দেখি বিডিওর আগমনে। বিডিও সাহেব দুর্গম পথ পেরিয়ে টোটো পাড়ায় এসেছে। তাতে সবাই কৃতার্থ। তিনি বলেন , এ হল ওয়ার্ক এথিকসের প্রশ্ন। নিজে সরেজমিনে না ভিজিট করলে ড্যামেজের ইভ্যালুয়েশনে গন্ডগোল থেকে যায়, করাপশন র‍্যাম্প্যান্ট হয়, সরকারের টাকা জলে যায়"নিজের বিষয়ে তিনি বলেন কলকাতার অ্যান্ডারসন ক্লাবে আমার নাম ছিল জল কুমির। সুইমিংপুল তোলপাড় করা ছিল আমার হবি.. বডির মাসল স্ট্রাকচারটা তো আর নষ্ট হয়নি' এরপরেই উপন্যাসিকের অসামান্য ব্যঙ্গ কৌতুক, ‘চর্বি বা মেদ যদি মাসেল হয় তবে সেখানকার মানুষের জনসমাগম হ্যামিল্টন গঞ্জের মেলার রাতের জনসমাগমকেও হার মানিয়ে দেয়" 

উপন্যাসের শেষে দেখি অরণ্য বিভাগের বিট অফিস কেউ পুড়িয়ে জ্বালিয়ে দেয়। জঙ্গলের ভিতর দিয়ে নিরুদ্দেশে চলে যায় ধানুয়া টোটো। "জঙ্গল পাহাড়ের ধ্বংস ডেকে আনা সভ্যতার বিরুদ্ধে তার বিদ্রোহের জানান দিতেই কি জঙ্গলে মিশে যাওয়ার আগে সে ওই সভ্যতার প্রতীক কে পুড়িয়ে দিয়ে গেল? ‘ পাঠক বোঝে ধানুয়া তার প্রতিবাদ কল্পনার জগতে স্থাপিত করে গেল। রাষ্ট্র রাজনীতি, পঞ্চায়েত প্রধান, পুলিশ, আইন ব্যবস্থা কোথাও বিচার না পেয়ে তাদের ক্রম পশ্চাদপসরণের ও পরাজয়ের কাহিনী লিপিবদ্ধ করে রেখে গেল।

কিন্তু শেষে একটি প্রশ্ন থেকে যায় হরে কৃষ্ণ বাবুর পার্টির লোকজন ও বিরোধী পার্টি প্রকাশ গোলের লোকজন যারা সরল টোটোদের বিভ্রান্ত করল, প্রতিবাদী ধানুয়া কে 'নেশাড়ূ মাতাল ফালতু' লোক হিসেবে দাঁড় করাতে চাইল,তাদের পার্টি অফিস বা পঞ্চায়েত অফিস আগুন না জ্বালিয়ে বনবিভাগের বিট অফিস ও বনবাংলায় আগুন লাগিয়ে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ কি খানিকটা নরম পন্থা নয়? বিশেষত যে বনবিভাগ তাদের ক্রমাগত বৃক্ষচ্ছেদন ও বিক্রির পরিণাম বিষয়ে সচেতন করেছে। বাইরের আক্রমণের বিষ তো আসলে ঘরের ভিতরেও ঢুকে আসে। তাও তো দেখাতে ভোলেননি লেখক। ভয়ঙ্কর বর্ষাকালে প্লাবন টোটোপাড়া কে বাইরের জগত থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। বাড়ি গাছ পথ উপড়ে ধ্বস নামিয়ে। জঙ্গলি সংগ্রহ করতে যাওয়ার উপায় নেই অনাহারের ছায়া গভীর হয় "পঞ্চায়েতি কারবার করে যাদের আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়েছে তারা দুয়ার বন্ধ করে রেখে যেমন বৃষ্টির ছাঁট আটকায়, তেমনই অভাবী প্রতিবেশীদের সাহায্য চাইতে আসা আটকায়"। যে ধানুয়া রাষ্ট্রব্যবস্থার ফাঁকফোকর ধরে ফেলেছে তার রাগ শুধুমাত্র বন বিভাগের উপর পড়ে কি করে ? বহু তর্ক উথ্থাপিত করা, চিন্তা উসকে দেওয়া উপন্যাসটিকে আত্মজৈবনিক বলা হয়নি কিন্তু ছত্রে ছত্রে ধনীরাম আর ধানুয়া টোটো কখন যে এক ও অবিচ্ছেদ্য হয়ে যান তা স্বয়ং লেখক ও হয়তো টের পান না।