সম্পাদকের কলমে
রবীন্দ্রনাথ তাঁর সমাপ্তি গল্পে লিখেছেন, ‘ পাগলি মৃন্ময়ী কে অনেকেই ভালোবাসিত, কিন্তু তাই বলিয়া নিজের পুত্রের বিবাহযোগ্যা বলিয়া কেহ মনে করিত না।’ তিনটি মাত্র সংখ্যা প্রকাশ পাওয়ার পর চতুর্থ সংখ্যার চৌকাঠে দাঁড়ানো বই কথা — যা নাকি বাংলা বই নিয়ে কথা বলার নতুন পত্রিকা, তারও অনুরূপ দশা। অনেকেই প্রভূত প্রশংসা করেন, বিষয়বস্তুর, নির্বাচিত বইয়ের, আলোচকদের সাম্মানিক দেবার সৌজন্যের, কিন্তু শেষ পর্যন্ত পত্রিকাটি কিনে বাড়ি নিয়ে যাবার পদক্ষেপ টি ঘটে ওঠেনা। যাঁরা বলেন , আলোচকের সাম্মানিক ও প্রকাশের খরচের সঙ্গে জুড়ে পত্রিকার দাম ঠিক করা উচিত, তাঁরা পত্রিকার গ্রাহকদের মানসিকতার সঙ্গে পরিচিত নন। সেই মত দাম ধরলে বইকথার যে সব হাতে গোণা ক্রেতা , তাঁরাও উবে যেতেন।অনেকে আবার উপদেশ দেন, যেখানে দুশো টাকা দিয়ে বই কিনতে বাঙালী প্রস্তুত নয়, সেখানে সে একই দামে, বই নিয়ে কথা বলার কাগজ কিনবে কেন? বিশেষ, যাঁদের বই নিয়ে কথা , তাঁদের নব্বই শতাংশ সাহিত্যের নবরত্ন সভার সদস্য বা নক্ষত্রমণ্ডলীর আলোয় উজ্জ্বল নন।বই কথার ভাবনা তৈরি হয়েছিল, যাঁদের বই বড় বাণিজ্যিক কাগজে আলোচনার জন্য স্থান পায়না, তাদের বই নিয়ে কিছু টা বিস্তৃত আলোচনার উদ্দেশ্যে।যাই হোক, ক্রেতা - পাঠকের দাক্ষিণ্য যদি বই কথা এখনো না পেয়ে থাকে, তার দায় তাঁদেরই মাথায় চাপানোর মত সংকীর্ণতা আমরা দেখাতে পারিনা। বরং আরো মত বিনিময় হোক, কনটেন্ট ও রূপ নিয়ে, নতুন আলোচকরা আসুন, পাঠকরা ভালো অথচ ঈষৎ ছায়াময়তায় অবস্থিত বইয়ের সংবাদ দিন, এবং আমরা কাদায় গুণ টেনে সাধের নৌকাটি আর ও কিছু দিন টেনে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি। ইতিমধ্যে বইকথার একটি ওয়েবসাইট তৈরি হয়েছে। প্রথম তিনটি সংখ্যায় প্রকাশিত লেখা তাতে ক্রমশ আপলোড করা হবে। এতে বইকথার পাঠযোগ্যতা কিছুটা প্রসারিত হবে।সেই অবসরে মুদ্রিত বইকথার ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবার কিছুটা অবকাশ পাওয়া যাবে।
এখন তরুণ যাঁরা লিখছেন, যাঁদের পিছনে না আছে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের , বড় প্রকাশকের বা সরকারের করুণা দৃষ্টি, তাঁদের জন্য সময় খুব সুখের নয়।নবীন সম্পাদকরা ও এখন লেখার গুণমানের চেয়ে লেখকের প্রাতিষ্ঠানিক পদমর্যাদা ও সামাজিক সংযোগ কে বেশি গুরুত্ব দেন।বাণিজ্যিক সংবাদপত্র শাসিত বাংলাসাহিত্যে এই প্রবণতা যে নতুন দেখছি তা নয়,তবে নানা ক্ষমতা বৃত্তের সমাপতন ও সংযোগের এমন উন্মুক্ত চেহারা বাংলা লেখালিখির জগতে দশ বছর আগেও দেখিনি। এর পরিণতি দেখছি সোশ্যাল মিডিয়াতে । সাহিত্য জগতের ক্ষমতার দাক্ষিণ্য পুষ্টদের পেশী সঞ্চালন।এঁরা যদি শিল্প বা বাণিজ্যের প্রতিভূ হতেন, বোঝা যেত, কিন্তু পাঠকপ্রিয় গুণী লেখকরাও এই পেশী প্রদর্শনে জুটে গেছেন।এখানে লিঙ্গসাম্যের সন্ধান করাও অর্থ নেই,এ হল, নির্ভেজাল ক্ষমতার নির্লজ্জ খেলা। আমার মত যাঁরা চার দশকের বেশি সময় ধরে লিখছেন, তাঁদের জীবনে লেখার পথটি মোটামুটি নির্দিষ্ট হয়ে গেছে।লিখতে ভালোবাসি বলে লিখি, লেখা ছাড়া জীবনে অন্য অন্বেষণ নেই।কিন্তু নবীন যাঁরা সবে লিখতে এসেছেন, পাঁচ দশ কি পনেরো বছর একমনে লিখছেন, এবং মাথা উঁচু করে, কৃপাপ্রার্থী না হয়ে লিখে যেতে চান, তাঁদের জন্য নির্জন যাত্রা পথের পাথেয় হিসেবে ভালো পাঠক, সম্পাদক, প্রকাশকদের আলোক স্তম্ভ থাকা প্রয়োজন। আর দরকার বই কথার মত আরো কিছু পত্রিকা। পাঠকের সঙ্গে লেখককে মিলিয়ে দেওয়ার কাজ করার জন্য আরো অনেক উদ্যম দরকার।
কার্তিক মাস এসেছে। দুর্গাপুজো পরবর্তী অবসাদে ধুঁকছে শহর। বাঁশ। ত্রিপল। কাপড়। নানা অজৈব বর্জ্যের স্তূপ চারিদিকে। আনন্দের নেশার যেন অন্তহীন পরমায়ু। অকর্মণ্য পুর- ব্যবস্থা র সামনে দিয়ে ডেঙ্গির মত প্রতিরোধযোগ্য অসুখে চলে গেল কতগুলি তাজা প্রাণ।এরই মধ্যে বসে শ্বাস টুকু জলের উপরে রেখে আমাদের কাজ করে যাওয়া।আমাদের নির্জন লেখালিখি।হেমন্তের হলুদ রৌদ্রে সুস্থ, প্রাণবন্ত জীবনের কামনা করি সবার জন্য।
অনিতা অগ্নিহোত্রী।
কলকাতা ।নভেম্বর ২০২৩।