সম্পাদকের কলমে
কলকাতা আন্তর্জাতিক বই মেলা মাথার উপর দিয়ে বেরিয়ে গেল এক বিশাল ঢেউ এর মত। এবছর প্রকাশিত বাংলা বই এর সংখ্যা ছিল গত বছরের তুলনায় অন্তত ৪০ শতাংশ বেশি।প্রকাশিত সংবাদ ও লেখকদের সোশ্যাল মিডিয়া তে দেওয়া তথ্য থেকে এই রকম আন্দাজ করা যায়।করোনা কালে নিকট জনকে হারানোর বেদনা, আশংকা, জীবনের উপর মৃত্যুর ছায়া আমাদের দিয়ে নিভৃতবাসে লিখিয়েছে অনেক বেশি। অনেকে নিজের পুরোন লেখা পত্র পাণ্ডুলিপি আকারে গুছিয়ে নেবার সময় পেয়েছেন। আবার অনেকের মনে হয়েছে, যা কিছু লেখা হল, সেটাই হয়ে উঠুক এক নতুন পাণ্ডুলিপি।কে জানে কখন কার দিন শেষ হয়ে আসে? অতএব কলকাতা বই মেলার দিকে বই এর অভিযাত্রা। ফলও হয়েছে যথা প্রত্যাশিত। ঘোষিত বইয়ের ৪০ শতাংশের মত প্রকাশ পায়নি, বই মেলার শেষদিনেও। নতুন প্রকাশক রা বই বাণিজ্যে এসেছেন সত্যি। কিন্তু বই নির্মাণের পরিকাঠামো যদি না প্রসারিত হয়, তবে প্রকাশকের সংখ্যাবৃদ্ধি হলেও বই এর নির্মাণের কাজ গতি পায়না। বরং ছাপার ভুল, খারাপ বাঁধাই, এবং বিলম্বে প্রকাশ -এই হবে বাংলা বই এর ভবিতব্য। ত্যাগস্বীকারের মত মনে হলেও বইমেলায় বই প্রকাশের লক্ষ্য লেখকদের পরিহার করাই ঠিক। সেই অর্থে যে কোন সময় সীমা বা শুভ দিনের পূর্ব নির্বাচন অকারণ চাপ সৃষ্টি করতে পারে শিল্পের উপর। বই প্রকাশ হোক সারা বছর। পাঠকের পকেটের জন্যও তা বেশি সহনীয়।
অভিজ্ঞতা থেকে দেখছি ৬-৮ মাসের কমে ভালো ভাবে একটি বই নির্মাণ এবং প্রকাশ সম্ভব হয়না। কাজেই বর্ষার পর যে সব বই এর কাজ আরম্ভ হয়, সেগুলি ই বই মেলায় প্রকাশ করা সম্ভব। এর মধ্যে যদি কোনোটি দ্রুত তৈরি হল, তা ব্যতিক্রম। যাঁরা মুদ্রণ এর সঙ্গে জড়িত, কম্পোজ, প্রুফ দেখেন তাঁদের পরিশ্রম মেলার আগে অত্যধিক বেড়ে যায়। কিন্তু পারিশ্রমিকের হার বাড়েনা। আমার জানা নেই নতুন কর্মী রা এই সব পেশায় কি হারে যোগ দিচ্ছেন। তাঁদের আকর্ষণ করতে হলে ভালো পারিশ্রমিক ও আধুনিক ট্রেনিং এর ব্যবস্থা করা দরকার।না হলে আমরা যে হারে বই এর সংখ্যা বাড়াচ্ছি তাতে নির্মাণ ও প্রকাশ শিল্পের চেহারা দাঁড়াবে উল্টো করা পিরামিডের মত।
ছোট প্রকাশকদের আরো একটি সমস্যা আছে। কলকাতা বই মেলা তাদের জন্য সব চেয়ে বড় বিপণন ব্যবস্থা নয়। বরং জেলা মেলা গুলিতে বই বিক্রির সুযোগ বেশি। অথচ তাড়াহুড়ো করে বড় মেলায় প্রকাশের পর দীর্ঘ এক খরা চলে জেলা মেলা পর্যন্ত। তাঁদের বিনিয়োগ করা টাকা তুলে আনার সুযোগ সংকীর্ণ হয়ে পড়ে । তারচেয়ে যদি সেপ্টেম্বরে বই প্রকাশের পরিকল্পনা করা হয়, তাহলে বিপণনের সুযোগের ক্রম হিসেবে সেটাই সবচেয়ে ভালো সময়। আরও একটা সমস্যা হচ্ছে, নতুন বই এর বন্যায় পূর্ব প্রকাশিত বা পুরোনো বইএর হারিয়ে যাওয়া। প্রিন্ট অন ডিম্যাণ্ড ব্যবস্থায় প্রকাশক দের কিছু আর্থিক সুবিধে হচ্ছে কিন্তু সপ্তাহান্তে হল থেকে চলে যাওয়া ছবির মত, পুরোনো বই আর পাওয়া যাচ্ছেনা। মেলা ভিত্তিক বই বিপণন , আমার মতে , চিরস্থায়ী ব্যবস্থা হতে পারেনা। বই বিক্রি হোক সারা বছর। আসুক বেশি সংখ্যক বইএর দোকান। তাতে অন্য পণ্য থাকলেও কোন সমস্যা নেই। লাইব্রেরির শূন্য পদ পূরণ হোক। আমরা এখন ডিজিটাইজড, কাজেই আমাদের লাইব্রেরী দরকার নেই, এমন কথা বলার মত পণ্ডিত উপদেষ্টা রা একটু বাংলার গ্রাম গঞ্জ নিদেনপক্ষ জেলা শহর ঘুরে আসুন।নিজেরাই উপকৃত হবেন।
এবার ও বইকথায় রইল প্রবীণ দের পাশাপাশি তরুণ লেখকের উপন্যাস গল্প কবিতা প্রবন্ধ কিশোর লেখনের আলোচনা।অধিকাংশ প্রকাশক বইএর সৌজন্য কপি দিয়েছেন আলোচনার জন্য। তাঁদের ধন্যবাদ। আলোচক রা লেখা সময় মত দিয়ে আমাদের কৃতজ্ঞ করেছেন। বেশ কিছু তরুণ আলোচক আমাদের কাজে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।আলোচকের ভূমিকায় অভিজ্ঞ লেখক দের সাহচর্য় থেকেও বইকথা বঞ্চিত হয়নি। এই সংখ্যা থেকে আলোচক সাম্মানিক ও সৌজন্য সংখ্যা পাবেন। পূর্ববৎ। অন্যদের পত্রিকা টি সংগ্রহ করতে অনুরোধ করি। লেখক, পাঠক, প্রকাশক সবারই প্রয়োজন লিটল ম্যাগাজিন সংগ্রহ করে ঘরে নিয়ে যাওয়ার। এমন চিরহরিৎ শস্য আর কোথায়? বই কথার আগামী সংখ্যা অগ্রহায়ণে । দরজায় দাঁড়িয়ে বৈশাখ। নতুন বছরের শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা জানাই সকল কে।
অনিতা অগ্নিহোত্রী ।
কলকাতা।