বসনঝোরা | বইয়ের প্রচ্ছদ
বসনঝোরা লেখক পাপিয়া ভট্টাচার্য প্রকাশক গাংচিল প্রকাশিত ২০১৯
তপন বন্দ্যোপাধ্যায়

অনেকদিন পরে এমন একটি উপন্যাস পড়লাম যার শুরুতে বর্ণিত এক বৃদ্ধার নিঃসঙ্গ জীবন, পড়তে পড়তে যেইমাত্র মনে হচ্ছিল খুব সরল এক মধ্যবিত্ত জীবনের গল্প, তখনই নড়েচড়ে বসে উপলব্ধি করলাম একটু একটু করে উপন্যাসে প্রবেশ করছে অনেকগুলি চরিত্র যাদের মধ্যে আবর্তিত প্রতি দিনের প্রতি মুহূর্তের টানাপোড়েন, সেই আবর্তে পাঠকও ঘুরপাক খেতে থাকেন, একসময় বিভ্রান্ত হয়ে ভাবতে থাকেন কোন গোলকধাঁধায় পৌছোতে চাইছেন লেখক!

পাপিয়া ভট্টাচার্যের “বসনঝোরা, পড়তে গিয়ে এরকম একটি আশ্চর্য অভিজ্ঞাতার সম্মুখীন হলেন বর্তমান আলোচক। ইতিপূর্বে 'আলোধুলোমাখা' উপন্যাসটি পড়েছিলাম সম্ভবত বছর দুয়েক আগে,কোথাও আলোচনা করেছিলাম কিনা স্মরণে নেই, কিন্তু সেই উপন্যাসের পটভূমি ছিল নেদারল্যান্ড, উপন্যাসের নায়িকা সেখানে বেড়াতে গিয়ে সন্ধান পেয়েছিলেন এক অভিনব প্রেমের আখ্যানের। 'বসনঝোরা' উপন্যাসেও প্রেম আছে তবে তার অভিঘাত অনেক তীব্র, অনেক দুঃসহ।

মণিলেখা তিন কাল পেরিয়ে যাপন করছেন একাকী জীবন, দশ বছর আগে তাঁকে ছেড়ে চলে গেছেন অবনীশ, সেই নিঃসঙ্গতার দিনকালে হঠাৎ এক ঘর-পালানো যুবতী ডলি ও তার শিশুপুত্র বিট্টু তাঁর কাছে আশ্রয় পায়। বিট্টুকে নিয়ে নতুন করে বেঁচে থাকার আনন্দ খুঁজতে থাকেন মণিলেখা। ডলি কে তা তিনি জানেন না, কিন্তু ক্রমে আবিষ্কার করেন মেয়েটি কিছুটা স্বেচ্ছাচারী, তার সুদর্শন, নিরীহ অথচ পঙ্গু স্বামী শান্তনুর স্বামীত্ব পছন্দ নয় বলেই ঘর ছেড়ে পালিয়ে এসেছে এখানে।

নিঃসন্তান অবনীশ ও মণিলেখার পরিবারে তার আগে আশ্রয় পেয়েছিল আর এক নিঃসন্তান দম্পতি মানিক ও আরতি। কুদর্শন মানিক ছিল পুরোহিত, তার স্ত্রী আরতি অসম্ভব সুন্দরী, কিছুকাল এ- বাড়িতে থাকার পর তারা চলে যায় অন্যত্র। আড়াই দশকেরও বেশি সময়কাল তাদের আর কোনও আগমন ঘটেনি মণিলেখার জীবনে। না-হলেই হয়তো ভালো হত, কিন্তু বিধবা, বিগতযৌবনা আরতি হঠাৎ এ-বাড়িতে উপস্থিত হওয়ায় উন্মোচিত হল এক বিশাল রহস্যের। সেই রহস্য আপাতত আবরিত থাক পাঠকের কৌতুহল মেটাতে।

উপন্যাসের আর এক জটিল সম্পর্ক মণিলেখার পরিবারের অন্য অংশে, সেখানে সদাব্রত ও দেবব্রত থাকেন তাঁদের দুই পুত্র নিয়ে। স্নিগ্ধ পরিবারের জ্যেষ্ঠ পুত্র, লেখাপড়ায় অসম্ভব ভালো, বাড়ির গর্বও বটে, হঠাৎ ভালো চাকরি নিয়ে মুম্বই পাড়ি দিয়ে সেখানেই এক বোহেমিয়ান গুজরাটি কন্যা জুনির প্রেমে পড়ে ও তাকে বিবাহ করে বা বলা যায় বিবাহ করায় স্নিগ্ধর সম্পর্ক ছিন্ন হয় নিজের পরিবারের সঙ্গে। অন্য পুত্র অভ্র লেখাপড়ায় একটু 'কমা' হওয়ায় বাড়ির সমীহ পায়নি, না-পাওয়ায় তার ভিতরে প্রথম থেকেই হীনমন্যতা, তার বিয়ে হল চঞ্চলা অথচ অসম্ভব ভালো মেয়ে তরুণী মোহরের সঙ্গে। মোহরের সঙ্গে অভ্রর সমীকরণে প্রথম থেকেই অবনিবনা। অভ্রর চাই মোহরের সঙ্গে অবাধ যৌনত আর সন্তান। মোহরও সন্তান চায়, কিন্তু অভ্র হিংস্রতার কাছে সে অসহায়। মোহরের কাছে ইচ্ছেমতো যৌনতা না-পেয়ে অভ্র হিংস্র, ভয়ংকর। তাদের এই সম্পর্কের মধ্যে হঠাৎই, স্ত্রী জুনির দুর্ঘটনায় মৃত্যু হওয়ায় স্নিগ্ধর কলকাতায় ফিরে আসা, সঙ্গে পুত্র সন্তান পাপা। পাপা অতি সহজেই মোহরের ন্যাওটা হয়ে পড়ে, অথচ বাড়ির উপরতলায় স্নিগ্ধর ঘরে গিয়ে মোহরের পাপাকে ঘুম পাড়ানো নিয়ে অহেতুক এক জটিলতার সৃষ্টি।

একটি আখ্যান গ্রামের বাড়িতে, অন্য আখ্যান শহরের বাড়িতে, একই পরিবারের দুটি সমান্তরাল কাহিনির জটিলতাই এই উপন্যাসের বিষয়। পাপিয়া ভট্টাচার্য থাকেন কলকাতা থেকে অনেকটা দূরে, ঘাটালে, ছিলেন শিক্ষকতার পেশায়, নিজের শারীরিক অসুস্থতার কারণে স্বেচ্ছা অবসর নিয়ে এখন পুরো সময়ের লেখক। না, ঠিক বললাম না, একজন লেখিকার লেখায় পুরো সময় দেওয়া নিতান্তই অসম্ভব। ঘরের আর পাঁচটা কাজ সেরে তবেই। তার সঙ্গে অন্য একটি কারণে পাপিয়ার সময়ের অপরিসর --- তার শারীরিক অসুস্থতা তাকে ব্যস্ত রাখে নিত্যদিন।

তবু এত শত অপ্রতিকূলতার মধ্যেও পাপিয়া লিখে ফেলেছেন একের পর এক গল্প, অনেকগুলো উপন্যাস। যে-দুটি উপন্যাস আমি পড়েছি, দুটিই লেখার সময় খুবই নিমগ্ণ থেকেছেন পাপিয়া। দুটি সামজিক অপরাধের দিকে আঙুল তুলেছেন এক সমাজমনস্ক লেখকের দৃষ্টিকোণ থেকে।

লেখিকার এই বিশেষ প্রবণতাকে আরও গভীরভাবে বুঝতে পড়ে ফেললাম তাঁর দুটি গল্পও । যে- দুটি গল্প বেছে নিলাম দুটিতেই লিখেছেন দুই অপরাধীর কথা। তার একটি গল্পের নাম 'অসবর্ণ', টুটুলের জবানিতে গল্পটা বলা। বুলির মা কাজ করে টুটুলদের বাড়িতে। যোলো-সতেরো বছরের বুলির সঙ্গে প্রেম হয় ফিরোজের । দুজনে বাড়ি থেকে পালায়। পুলিশ ফিরোজকে ধরে আনে, নাবালিকা বিয়ে করার অপরাধে জেল হয় ফিরোজের। কোর্টে যাতায়াত করার সময় বিমল নামে এক যুবকের পছন্দ হয় বুলিকে। সব জেনেশুনেও বুলিকে বিয়ে করে বিমল। বিমল অসুস্থ হলে তাকে ভালো করে তোলে বুলি। ইতিমধ্যে ফিরোজ ছাড়া পায় জেল থেকে। উদবিগ্ন টুটুল ভাবে ফিরোজ কি শোধ নেবে বুলির উপর! হঠাৎ ফিরোজ আহত হয় দুর্ঘটনায়। বুলি প্রচুর সেবাযত্ন করে সারিয়ে তোলে তাকেও । বুলি আসলে এখনও ফিরোজেকই শুধু ভালোবাসে, ফিরোজ-জীবনের প্রথম প্রেম।

পরের গল্প, 'কুয়োটা গভীর', গোরাচাঁদ মিশ্রের ঘরে ভোর থেকে এফ এম বাজে। হঠাৎ বাতাসে দুর্গন্ধ ভেসে আসতে গিয়ে দেখে তাদের বাড়ির পরিত্যক্ত কুয়োতে দুটি লাশ। এক যুবক আর এক যুবতীর। সুজয় নামে এক যুবক বাবার মৃত্যুর পর এক সম্পন্ন পরিবারের বাড়িতে ট্রাক্টর নিয়ে চাষ করতে যায়। সে-বাড়ির একটি মেয়ের সঙ্গে তার সম্পর্ক তৈরি হয়। জানাজানি হতে বিধবা মায়ের একমাত্র ছেলে সুজয় খুন হয়। খুনের সাক্ষী থাকে এক মাতাল বেনু। পেটে মদ পড়লেই শুঁড়িখানায় বিষয়টি নিয়ে গোলমাল করে রোজ। ফলে একদিন কেউ তার মদে বিষ মেশায়। স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গেলে আততায়ীরা তাকে ও তার বউকে একসঙ্গে খুন করে ফেলে দিয়ে আসে কুয়োর মধ্যে। পুলিশ কোনও খুনেরই প্রমাণ পায় না। থানায় সদ্য আসা দারোগা সব বুঝতে পারেন। তাঁর আগের দারোগা সব জেনেও ক্রিনচিট দিয়ে গেছেন অপরাধীদের, তাঁর আর কিছু করার থাকে না।

দুটি গল্পেই দুই অপরাধের কাহিনি লিখেছেন পাপিয়া। এবার লিখি 'বসনঝোরা'য় বর্ণিত অপরাধের গল্প পাপিয়া খুব দক্ষ কারিগরের মতো একটু একটু করে খুলেছেন অপরাধের বৃত্তান্ত, রহস্যের বাতাবরণ। কিন্তু এটি তো আদপেই রহস্য উপন্যাস নয়। পাপিয়া একের পর এক এক-একটি নতুন চরিত্র এনেছেন, মনে হবে খুবই নিরীহ চরিত্র, পাঠক বুঝতেই পারবেন না কার মনে কী 'পাপ' ছিল, কে প্রকৃত অপরাধী। তবে এই অপরাধ কি সত্যিই কোনও ক্রাইম! মানুবজীবনে এরকম অপরাধ প্রায়শ ঘটে থাকে, কিন্তু ধরা না-পড়লে যেমন বেকসুর খালাস পেয়ে যায় অপরাধী, তেমনই এই উপন্যাসে আড়াই-তিন দশক আগে ঘটে যাওয়া অপরাধটির কথা হয়তো কোনও দিনই জানতে পারতেন না মণিলেখা, না-জানলেই তো ভালো হত, তা হলে তো সেই অপরাধ এত দীর্ঘ সময় পরে এভাবে টাল খাইয়ে দিত না তাঁকে ! যদি না এত কাল পরে মণিলেখার জীবনে আবার আগমন ঘটত আরতির, যদি না বিট্টুকে খুঁজতে মণিলেখা হাজির হতেন শান্তনুর খোঁজে, আর আরতির ছেলে শান্তনুকে চোখের দেখা না দেখতেন, তা হলে তো জীবন প্রবাহিত হত জলের মতো সহজসরল। কিন্তু যেই না দেখলেন শান্তনুকে, আবিষ্কার করলেন আরতির মতো তারও একটা পা খুঁতো, কিন্তু বাকি শরীর হুবহু অবনীশের মতো, অমনি মণিলেখার জীবনে নেমে এল দীর্ঘ বছর আগে ঘটে যাওয়া অপরাধের শাস্তি। শাস্তি তো পেলেন মণিলেখাই, তাঁর নিরীহতাই তাঁর অপরাধ, নিরীহতার পাপে পেলেন এতবড়ো একটা শাস্তি।

এই উপন্যাসে সমান্তরালভাবে ঘটে চলেছে আরও একটি অপরাধ। মোহরের অপরাধ তার নিঃসন্তান নারীমন ভালোবেসেছিল একটি মা-হারা শিশু পাপাকে,তাকে বুকে টেনে নিয়েছিল-একই সঙ্গে নিজের সন্তানহীনতার ফাঁক পুরণ করতে, আবার দুর্ঘটনায় মৃত পাপার মায়ের জায়গা নিতে। এই 'ভয়ংকর' অপরাধের শান্তি হিসেবে তাকে প্রবলভাবে যৌনলাঞ্ছনা করল অভ্র। আবার যখন সত্যিই মোহরের গর্ভে হল ভ্রুণের সঞ্চার , তাকে ছুঁড়ে ফেলে দিল পাপোষের মতো। অভ্র তাকে নিত্যব্যবহার করেছে, অথছ অস্বীকার করে বলল এই ভ্রণ তার ঔরসের নয়, তার জোঠতুতো দাদা স্নিগ্ধর। কোনও অপরাধ না-করা সন্বেও শাস্তি পেল মোহরই। এই শাস্তি মাথা পেতে নিয়ে মোহর এখন কোথায় যাবে!

স্বামী-পরিত্যক্তা হয়ে মোহর তখন আশ্রয় চাইল তার কলেজের সহপাঠী সুমন্তর কাছে, যে সুমন্তকে তারা একসময়ে পরিহাস করেছে, সেই সুমন্তই তাকে ডেকে নিয়ে গেল তার বাড়িতে, তার বাড়ির লোকদের প্রবল আপত্তি সন্বেও। আবার যে ভ্রূণ বহন করার অপরাধে মোহরকে বেরিয়ে যেতে হল বাড়ি থেকে, সেই ভ্রূণ নিজেই প্রবল বিরক্তিতে, তীব্র ঘৃণায় ভূমিষ্ঠ হতে আপত্তি করে বিদায় নিল মাতৃগর্ভ থেকে।

সমস্ত দিক দিয়ে নিঃস্ব, ভেঙে চুরচুর হওয়া মোহরের সামনে এখন একটা শূন্য পৃথিবী ছাড়া আর কিছু নেই। সেই অপরিসীম, অনন্ত শূণ্যতা থেকে মোহর চাইল বেরিয়ে আসতে। তার ভাগ্য হয়তো এই প্রথম প্রসন্ন হল তার উপর, সে খুঁজে পেল পাপার মতো আরও বহু মাতৃহারা শিশুকে, পেল পায়ের নীচে হারানো মাটি-এক স্বাধীন জীবন।

এ উপন্যাসর দুটি আখ্যান, একই পরিবারের দুই খন্ডাংশের অপরাধের কাহিনি। শুধু পার্থক্য এই যে, ভারতীয় দন্ডবিধি অনুয়ায়ী শাস্তি পায় অপরাধী, এখানে দুটি অপরাধেরই ফলে শাস্তি পেল দুই নিরপরাধ নারী। উপন্যাসটি পড়ে আমার মতো পাঠকও নিশ্চয় আশ্চর্য হবেন, আমাদের সমাজের প্রচলিত আইন কী অসম্ভব ঠুনকো। এ ধরনের অপরাধ প্রতিদিন প্রতিমুহূর্তে আরও বহু ঘটে চলেছে , কিন্তু অপরাধীরা শাস্তি পাওয়ার বদলে শাস্তি পায় নিরপরাধ নারী।

নিঃসন্দেহে এই উপন্যাস খুব সাধারণ কাহিনির মোড়কে এক বিস্ফোরক। পাপিয়া তাঁর উপন্যাসে কি এই প্রশ্ন তুলতে চেয়েছেন ভারতীয় দণ্ডবিধির সমান্তরাল কোনও সামাজিক দগ্ডবিধি রচিত হওয়া কি প্রয়োজন!