বাঙালির পথঘাটের খাওয়া-দাওয়া | বইয়ের প্রচ্ছদ
বাঙালির পথঘাটের খাওয়া-দাওয়া লেখক বিবিধ লেখক সম্পাদক অর্দ্ধেন্দুশেখর গোস্বামী প্রকাশক সুপ্রকাশ
রামামৃত সিংহ মহাপাত্র

পথঘাটের খাবারের ইতিহাস বেশ প্রাচীন। প্রকৃতপক্ষে মানুষের খাওয়া-দাওয়া শুরুই হয়েছিল পথঘাটে।আগুন আবিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গেই বদলে যায় মানুষের খাদ্যাভাস।সেই হিসাবে মানুষের খাদ্য বিবর্তনের ইতিহাসও কম চমকপ্রদ নয়।খাদ্যাভাসের এই পরিবর্তন সারাবিশ্বের সঙ্গে সঙ্গে ঘটেছে বাঙালিদের মধ্যেও।'ওয়ার্ল্ড রিভিউ অফ নিউট্রিশন অ্যান্ড ডায়েটেটিকস' তাদের ছিয়াশি নং ভল্যুমটাই বের করেছে স্ট্রিট ফুডের উপর।খ্রিস্টপূর্ব ছয় শতকে গ্রীসে স্ট্রিট ফুডের হদিস মিলেছে।বর্তমানে জনপ্রিয় ফ্রেঞ্চ ফ্রাই ফ্রান্সে স্ট্রিট ফুড হিসাবে আবির্ভূত হয় প্রায় ১৮৪০ সাল নাগাদ।

তবে বাঙালির বা বাঙলার পথ-খাবারের সন্ধান করতে গেলে উঠে আসে চিঁড়ে,মুড়ির কথা।আর পুরো ভারতবর্ষকে ধরলে বলতে হয় দূর পথের পথিক সঙ্গে নিতেন কোথাও লিট্টি আবার কোথাওবা ভাজা ভুট্টা বা যবের গুঁড়ো। বর্তমানে বদলে গেছে এই পথ খাবারের ধারণা।এখন আর কাউকে খাবার পুঁটুলি বেঁধে পথে বেরোতে হয় না,নানারকম খাবারের পসরা সাজিয়ে বসে আছেন খাবারের দোকানদারেরা।এই খাবারের স্বাদ,রকম বদলে যায় ভৌগলিক সীমা পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ।আবার সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জনপ্রিয়তা হারিয়েছে বহু খাবার,তেমনি জনপ্রিয়তার শীর্ষে উঠে এসেছে নতুন নতুন খাবার।সেই হিসাবে খাবারের বিবর্তনের গতিপথ সহজ নয়।তাই এই নিয়ে গবেষণা করাও জটিল। এই জটিল কাজটিই সুন্দর ভাবে উপস্থাপন করেছেন অর্দ্ধেন্দুশেখর গোস্বামী, তাঁর সম্পাদিত "বাঙালির পথঘাটের খাওয়া-দাওয়া" বইটির মাধ্যমে।

বিষয় বৈচিত্র্য নির্মাণে এবং তার উপস্থাপনে সম্পাদক তাঁর মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন। বিষয়বস্তুকে কয়েকটা পর্বে ভেঙ্গে নিয়েছেন। যার প্রথম পর্ব "সংকটের খাদ্য থেকে 'পথের খাবার': একটি পরিক্রমা। "এই লেখাটি লিখেছেন অর্পিতা সরকার।লেখিকা সুখপাঠ্য গদ্যে তুলে ধরেছেন দুর্ভিক্ষ কালীন সময়ে উদ্ভব হওয়া খাদ্যের কথা ।আমরা হয়তো অনেকে জানিই না বিরিয়ানির উৎসে মিশে আছে দুর্ভিক্ষ ও আকালের ইতিহাস।আলেকজান্ডারের যুদ্ধ শিবির হয়ে মুঘল জমানার শাহী পদ খিচুরি কিভাবে হয়ে গেল ত্রাণ শিবিরের প্রধান খাদ্য বা মিশর পৌঁছে এই 'ওয়ান পট মিল' কিভাবে খেটে খাওয়া মানুষের খাবার 'কশুরি 'তে পরিণত হলো,তা পড়তে পড়তে বিস্মিত হতে হয়।এইরূপ বহু খাবারের কথা লেখিকা তুলে ধরেছেন যা এক সময় স্ট্রিট ফুড হিসাবে জনপ্রিয় হলেও পরে হয়ে উঠেছে উচ্চবর্ণের স্ট্যাটাস সিম্বল বা কিভাবে কোন কোন খাবার ব্যবহৃত হয়েছে প্রতিবাদের ভাষা হিসাবেও।

বইয়ের শুরুতেই যেমন অনুসন্ধান করা হয়েছে দুর্ভিক্ষ কালীন উদ্ভূত বিভিন্ন খাবারের, তেমনি পরবর্তী অংশে উঠে এসেছে "পাড়া-বেপাড়ার চুরমুর- হজমিগুলিরা"-র কথা।এই অধ্যায়টি পড়তে পড়তে বারবার স্মৃতিকাতর হয়ে পড়তে হয়।চোখের সামনে ভেসে ওঠে বয়াম ভর্তি চুরমুর বা হজমিগুলি।কানে ভেসে আসে হাঁক দিয়ে যাওয়া ফেরিওয়ালার ডাক।মোট এগারো জন লেখক-লেখিকা এই পর্বে তাঁদের শৈশব-কৈশোরের স্মৃতির ঝাঁপি উবুড় করেছেন।এই পর্বে উঠে এসেছে একাটাকা কয়েনের সাইজের সিকি-কচুরি,রাস্তার ধারে বিক্রি হওয়া ঘুঘনি, আলুর চপ,বেগুনি, ফুলুরি, বোম, আচার, মটর মাখা, চালভাজা, ঝালমুড়ি, ছোলাসেদ্ধ, তেঁতুলের চাটনি, সস্তার আইসক্রিম, কুলমাখা, বরফ দেওয়া লাল-হলুদ-নীল সুগন্ধী সরবত,মাছ লজেন্স, টিকটিকির ডিম লজেন্স সহ সেইসব হাঁকডাকের কথা যা মনে পড়লে আজও স্মৃতিমেদুর মন পষ্ট শুনতে পায়-"কিছু সবজি, কিছু ফল/বাংলার বায়ু, বাংলার জল/জলের দরে ফলের রস/আপনি না খেলে, আপনার লস।"

কল্লোল লাহিড়ী-র লেখা "সেইসব মুখরোচক উড়ন্ত বিকেলগুলো " পড়তে পড়তে অবধারিত ভাবে মনে পড়ে যাবে নিজেদের বয়ঃসন্ধিকাল আর বেড়ে ওঠার সময়টা,"কোচিং-এ লুকিয়ে একটা হাতের ওপর আর একটা হাত।সার দেওয়া নক্সাকাটা সব চিঠি।একটা রোল দুটো ভাগ করে নেওয়া।ঝিরঝিরে বৃষ্টির রাতে প্রথম প্রেমের চিঠিগুলো পুড়িয়ে ফেলা।প্রথম সিগারেটে টান।কুচো অমলেটে বিড়ির গন্ধ।লেনিনকে সাক্ষী রেখে পড়ন্ত বিকেলে প্রথম চুমুর স্বাদ।"

'পাড়া-বেপাড়ার চুরমুর-হজমিগুলিরা' পর্বে যেমন কিশোর বয়সের চির আকাঙ্খিত মুখরোচক খাবারগুলো তুলে ধরা হয়েছে,তেমনি পরের পর্ব 'টিফিনের ঘন্টা বাজে'-তে উঠে এসেছে টিফিনের সময় স্কুলের গেটে যে সমস্ত খাবারের লোভে কিশোর-কিশোরীরা ভিড় জমাত সেই সব খাবারের কথা।যেমন 'স্কুল,রতনকাকু ও চাউমিন ' লেখায় মেলা ভট্টাচার্য লিখেছেন, "ব্যারাকপুর গার্লস হাইস্কুলের উঁচু পাঁচিলের বাইরে ছিল কৈশোরের প্রেম ফুচকার সাথে, চুরমুরের সাথে, ঘুঘনির সাথে।'

তবে পাড়া-বেপাড়ার চুরমুর হজমিগুলিরা এবং টিফিনের ঘন্টা বাজে পর্বের লেখা গুলির অনেকগুলোই পুনরাবৃত্তি মনে হতে পারে।ধৈর্য্য হারা হতে পারেন পাঠক।এই প্রসঙ্গে সম্পাদক 'সম্পাদকীয় অনুবন্ধ'-তে স্পষ্টতই জানিয়েছেন, "প্রথম বিভাগের কয়েকটি লেখা পৌনঃপুনিকতা দোষে দুষ্ট বলে মনে হতে পারে।কিন্ত সে-সব লেখায় গদ্যের স্বাদ বৈচিত্র্য পৌনঃপুনিকতার ক্লান্তি অননোদনে সহায়ক হবে বলে আশা করা যায়।"

প্রথম দুটি পর্ব পৌনঃপুনিকতা দোষে দুষ্ট হলেও বিষয় বৈচিত্রের অভিনবত্ব প্রকাশ পেয়েছে শেষ দুটি পর্বে।'ঘুরি ফিরি খাইদাই' পর্বের চারটি লেখার বিষয় ভাবনা পৃথক।'হাত চলে,মুখ চলে, ছুটে চলে ট্রেন' শিরোনামে লেখাটিতে শিপ্রা সরকার তুলে এনেছেন রেল গাড়ির যাত্রীদের স্টার্টার থেকে, ভাজাভুজি, সকাল-সন্ধের জল খাবার,মরশুমী খাবার,কাঁচা খাবার,মিষ্টিমুখ নোনতামুখ,আঞ্চলিক খাবার,স্টেশনের খাবারের কথা।সেইসঙ্গে তথ্য দিয়েছেন মহিলা কামরার পানাহার এবং হকারদের বিক্রির কৌশল নিয়েও।"যেমন ধরুন, আপনি একমনে জানালা দিয়ে বাইরের দৃশ্য দেখতে দেখতে যাচ্ছেন, হঠাৎ করে কেউ বলে উঠল,'গলে গেল নাক গলে গেল' বা 'নাকে ধরবেন না,গলে যাবে।' আপনি চমকে তাকালেন।না, না আপনার নাক গলানোর কিছু নেই,দিলখুস বিক্রি হচ্ছে।"

পল্লব দাস অসামান্য ভঙ্গিমায় তুলে এনেছেন, "বড়োলোকের জল ছোটোলোকের দরে-ক্যানিং লোকালের 'ফটাস জল'-র কথা,তৈরি পদ্ধতি এবং লকডাউন পরিস্থিতিতে তাদের দুর্দশার কথা।

সৈয়দ মুজতবা আলি রচিত সেই বিখ্যাত লাইন মনে করুন,"ওগো ডুরা (ডোরা),সাবরে আরক কট্টা-মরগির সালন দে!"মিহির সেনগুপ্ত তাঁর 'বাল্যের খাওয়া-দাওয়ার স্মৃতি ও নদীপথ ভ্রমণ'-এ এই সালন তৈরির নিখুঁত বর্ণনা দিয়েছেন, "মুরগির মাংস মাঝারি টুকরো করে,ধুয়ে জল ঝরিয়ে নিয়ে শুকনো লঙ্কা,ধনে,আদা,সাদা জিরা, গোল মরিচ ও গরম মশলা, পিঁয়াজ, রসুন,হলুদ (অতি সামান্য পরিমাণে)দিয়ে ঘষতে হবে। বড়ো ওজনের মুরগির জন্য ২০০-২৫০ গ্রাম এবং অপেক্ষাকৃত ছোটো ওজনের মুরগির জন্য ১৫০-২০০ গ্রাম তেল লাগবে।মাংস সিদ্ধ হয়ে গেলে দুরকম ভাবে সম্বরা দেওয়া যাবে।৫০ গ্রাম আন্দাজ করে খানিকটা পেঁয়াজ গুঁড়ো ছাড়িয়ে অথবা জিরে, গোল মরিচ ও অল্প ধনে ভেজে গুঁড়িয়ে ছড়িয়ে দিতে হবে।যদি ঘি ব্যবহার করার ইচ্ছে না থাকে, তবে গরমমশলাও বাদ দিতে হবে।" "এরকমই ফুলকপি দিয়ে মুরগির সালন,মানকচু দিয়ে মুরগির সালন, থোড় দিয়ে মাংসের সালন।"

শুধু যে মাংসের সালনের বর্ণনা আছে,এমনটা নয়,মাছের সালনের কথাও আছে। উঠে এসেছে 'কাঙ্গট মাছের ছালুন' - এর কথা,কাঁঠালি, মৌয়া, কাঁজলি আরো নানারকমের হরেক চিংড়ি ও বাগদার কথাও।

ছোটোবেলায় কে না শুনেছে," চাঁদ মামা, চাঁদ মামা টিপ দিয়ে যেও,/ বাটা ভরা পান দিব গাল ভরে খেও।"সুপ্রিয় ঘোষ তাঁর লেখায় মনে পড়িয়েছেন প্রচলিত প্রবাদ,"ভালোবাসার এমনি গুণ,/পানের সঙ্গে যেমন চুন।/কম হলে লাগে ঝাল,/বেশি হলে পোড়ে গাল।''

প্রিয়াংশী মৌ রচিত 'বেনারসের পথঘাটের খাবার ' এ প্রসঙ্গক্রমেই এসেছে বিভিন্ন ধরনের পানের কথা-" বেনারসী পান।খাঁটি কুলীন।কাশীবাসীদের পানবিলাস চোখে পড়ার মতো।বেনারসের প্রত্যেক মহল্লায় ছোটোবড়ো পানের দোকান নজরে পড়ে।ভালো কথা,এই বেনারসী গলিতেই কম সে কম আরও নয় কিসিমের পান,পাতা ও মশলার তারতম্য অনুযায়ী-সাদা পান,পঞ্চমেওয়া পান, জর্দা পান, গুলাব পান,কেশরী পান,নবরতন পান,রাজরতন পান, আমাবৎ পান এবং গিলোরি পান।" কিভাবে তৈরি হয় এই বিশেষ ধরনের বেনারসী পান।তাও তুলে ধরেছেন লেখিকা, "মাণ্ডি থেকে কিনে এনে পানকে বেতের ঝুড়ি বা টুকরিতে করে চটের বস্তা ঢাকা দিয়ে একটা বদ্ধ ঘরে রাখা হয়।সেখানে টুকরির থেকে দেড় থেকে দু-ফিট দূরত্বে কাঠকয়লার ভাট্টি জ্বালানো হয় ছয় থেকে আট ঘন্টা।এভাবে তিন-চারদিন ধরে হালকা আঁচে একটু একটু করে পানপাতার রং গাঢ় সবুজ থেকে সাদাটে সবুজ হলে তা দোকানে আসে বেনারসি পানের খিলি বানানোর জন্য। কারণ, কাঁচা সবুজ পানের চেয়ে পাকা সাদা পানেরই স্বাদ বেশি।সেসব পানের আবার অনেক জাত-সাঁচি, দেশি,বাংলা,কড়ুই, গাজিপুরি, গেছো, ঘনগেঁটে, বাগেরহাটি, মঘাই, জুক্কি, চন্দ্রকলা, মাটিয়ালী, জগন্নাথ, মজাল, মিঠা,হরগৌরী, কর্পূরী ইত্যাদি।"তবে বেনারস মানে যে শুধু পান এমনটা নয়।পানের সঙ্গে সঙ্গে বেনারসের অলি-গলিতে পাওয়া বিভিন্ন পথ-খাবারও সমান গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা করা হয়েছে লেখায়।

নবাবের জায়গা মুর্শিদাবাদ। স্বভাবতই সেখানে পথ খাবারের অন্তর্ভুক্ত হবে নবাবী খানাও।এই প্রবন্ধের লেখক রাণা আলমের চমকপ্রদ বর্ণনা কৌশল আকৃষ্ট করবে পাঠককে।যেমন, " ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজীর কাছে হয়তো কাশিমবাজারের পঁয়তিরিশ টাকার চিকেন চপের খোশবাই পৌঁছেছিল,লর্ড ক্লাইভ হয়ত লালবাগের বাইরে বাগডহরার চপ খেয়ে বিলকুল ফিদা হয়েই মুর্শিদাবাদের তখত দখলের প্ল্যান করেছিলেন। "

'পুরুলিয়ার পরব, পার্বণ এবং প্রতিদিনের পথঘাটের খাবার-দাবার'-এর সুন্দর বর্ণনা করেছেন বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায়।"পুরুলিয়া মানে কাশিপুরের মতিচুর, পুরুলিয়া মানে ভাবরা ভাজা।পেঁড়া মণ্ডা তো আছেই এছাড়া আছে ফুলুরি, পাপচি, গজা, খাজা, কেন্দ পাকা, তালবড়া, আরসা পিঠে,আসকে পিঠে, গড়গইড়া পিঠা, তিল নাড়ু ইত্যাদি।" শুধু খাবারের কথাই উঠে আসে নি,লেখনিতে খাবারের সঙ্গে উঠে এসেছে পুরুলিয়ার সিগনেচার ঝুমুর গানও, যার মধ্যে সম্পৃক্ত হয়ে আছে বিভিন্ন খাবার।যেমন, " ভাদর মাসের গাদর জনাইর/আইড়ে বইসে খাব হে/যারেই দেইখব মনের মতন তারেই সঙ্গে যাব হে।"
কিংবা "কচড়া তরকারির জন্য মন ধরাধরি/তরকারি বাঁটলো মাইতোরী/ছটবাবু ভাত খায় নাই বড়কি খনঞ্জরি। "

বাঙালির পথের খাবার বলতে শুধু তো এপার বাংলার নয়,ওপার বাংলারও সমান গুরুত্ব রয়েছে।'ঢাকা ও সংলগ্ন এলাকায় পথের আঢাকা খাবার ' নিয়ে মনোঞ্জ রচনা লিখেছেন হামিদ কায়সার।তাঁর লেখায় ঢাকার পথের খাবারের বিবর্তনের ইতিহাস ফুটে উঠেছে লক্ষণীয় ভাবে।উঠে এসেছে কত ধরনের খাবারের কথা।"নিমকি পাহাড়ের মতো সাজিয়ে রাখা হতো জাত বিচার করে আলাদা আলাদাভাবে।কোনো নিমকি হলুদ রঙের, খেতে মচমচা,কোনোটি আবার লাল গুড়মিশ্রিত, আরেকটা ছিল সাদা রঙের, চিনিবেষ্টিত।তিনটির স্বাদ তিনরকম, কিন্ত থাকত একসঙ্গে পাশাপাশি মায়ামমতায় জড়িয়ে।"

'বাংলাদেশের গণভোজ'-এর চিত্র উঠে এসেছে সৈয়দ খালেদ সাইফুল্লাহের লেখায়।বাংলাদেশের অঞ্চল ভেদে যে গণভোজের আয়োজন বদলে যায় তাঁর ফুটে ওঠা চিত্র বিস্মিত করবে পাঠককে।আশুলিয়ার গণভোজের মূল উপাদান জাহাজী কোর্মা।জাহাজী কোর্মা কি তারও বর্ণনা রয়েছে।"আজকের থেকে ষাট-সত্তর বছর আগেও মানুষ যখন জাহাজে করে হজ করতে যেতেন বা ইরাক-ইরান-মালয়েশিয়া-সিঙ্গাপুর ব্যবসা করতে যেতেন;তখন সবাই চিনামাটির পাত্রে করে নিয়ে যেতেন এই জাহাজী কোর্মা।দিন পনেরো রেখে খাওয়া যায়।গরু বা খাসির হাড় ছাড়া মাংস মরিচ বাদে জয়তুনের তেলে রান্না করতে হয়।এখন আর মানুষ জাহাজে এই জিনিস খায় না।তবে নিমন্ত্রণ-জেয়াফতে খায়।"

গামলার বদলে মাংস বা ডাল দেওয়া হয় মাটির হাঁড়িতে।চামচের বদলে ব্যবহার করা হয় নারকেলের মালা।বিক্রমপুরের গণভোজে ভুনা মাংসের পরে আসে মুগের ডাল।এইভাবেই এক এক জায়গার গণভোজের বর্ণনা দিয়েছেন লেখক।

উপেক্ষিত হয়নি পাহাড়ও।'পাহাড়ে আহারে' কল্যাণ কুমার নন্দী লিখেছেন 'গানড্রাক' বা ''গন্দ্রুক' এর কথা।সর্ষে পাতা,কপি,মুলো ইত্যাদি সবজি মাটির পাত্রে দু-একদিন রেখে গাঁজানো হয়।তারপর সেটা মাংস দিয়ে পিঠে বানিয়ে সেল রুটি দিয়ে পরিবেশন করা হয়।সঙ্গে ছ্যাং (দেশীয় মদ )থাকলে জিভ তিড়িং বিড়িং করে লাফাবে।কারণ স্বাদ ও ঝাল,দুটোই সমানতালে পাল্লা দেবে।" আবার উঠে এসেছে লেপচা জনজাতির আতিথেয়তার কথা।"লেপচার আতিথ্যে থাকলে যে পানীয় দিয়ে প্রথম অভ্যর্থনা হবে তা হচ্ছে 'চি'।মিলেটকে গরমজলে ভিজিয়ে রাখলে যে রস নিষিক্ত হয় তা বাঁশ দিয়ে বানানো গ্লাসে ঢেলে হাতে তুলে দেয়।"

বলা অত্যুক্তি হবে না বইটি পড়তে পড়তে বিস্মিত হয়েছি বিভিন্ন সংস্কৃতির বিভিন্ন ধরনের খাবারের কথা পড়ে।হয়তো যা উঠে এসেছে তার বাইরে থেকে গেছে আরও বেশি। তবুও যেটুকু উঠে এসেছে তা জ্ঞান তৃষ্ণা নিবৃত্তি করবে পাঠকের,অনুসন্ধিৎসু মনে অনুসন্ধানের সহায়ক হবে,এই কথা নিশ্চিত রূপে বলা যায় ।