শহিদতীর্থ বরাক লেখক দিলীপকান্তি লস্কর প্রকাশক লালনমঞ্চ প্রকাশনী প্রকাশিত ২০২১

১৯৪৮-এর ৫ নভেম্বর কন্সটিটিয়েন্ট অ্যাসেম্বলির বিতর্কে শ্রীকৃষ্ণমাচারি স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন ভাষা-সাম্রাজ্যবাদের চরম বিপদের কথা '...I refer to this question of language imperialism. There are various forms of imperialism and language imperialism is one of the most powerful methods of propagating the imperialistic idea.' সেদিন বলেছিলেন অনেককে অস্বীকার করে একটি ভাষাকে 'রাষ্ট্রভাষা' বিবেচনা করার অসহিষ্ণুতা রাষ্ট্র-ভাষা-না-জানা মানুষকে দাস বলে গণ্য করা করবে। 'This kind of intolerance makes us fear that the strong Centre which we need, a strong Centre which is necessary will also mean the enslavement of people who do not speak the language of the legislature, the language of the Centre.' সেদিন তিনি `Hindi Imperialism' শব্দটি স্পষ্টভাবে উচ্চারণ করেছিলেন। রোখা গিয়েছিল রাষ্ট্রভাষার দাবি কিন্তু ১৯৬৫ সালে বহু প্রাণের বিনিময়ে আবারও দাবি প্রতিষ্ঠিত হল যে, ভারতে কোনো একটি ভাষা 'রাষ্ট্রভাষা' হতে পারে না। এজন্য দক্ষিণভারতে ভাষা-সচেতন-রাজনীতির একটি বিরাট ভূমিকা আছে। সংখ্যাগুরুর ভাষা 'রাষ্ট্রভাষা' হলে দেশের গণতন্ত্রের মূলে আঘাত পড়ে – একথা জেনেও 'রাষ্ট্রভাষা'র নাম ধরে ক্ষমতার অলিন্দে থাকার সুলভ প্রয়াস থামে না।

রাষ্ট্রের মতো রাজ্যের ক্ষেত্রেও একথা সত্য মেনে নিয়ে সংবিধানের ২৯, ৩০, ৩৪৭, ৩৫০ ধারায় ভারতের বহুত্ববাদী ভাষাসংস্কৃতির অধিকারের কথা বারবার বলা হয়েছে। তবুও লড়াই করে আদায় করে নিতে হয় তা; রক্তপাত ঘটে স্বাধীন দেশের নাগরিকদের। যতই ভাষাভিত্তিক রাজ্যের কথা বলা হোক না কেনো, ভারতে এক-ভাষী রাজ্য তাত্ত্বিকভাবেও থাকা সম্ভব নয়। কোনো রাজ্য তাই এক-ভাষার নিরঙ্কুশ সুবিধার অধিকার দাবি করলে অন্য রাজ্যে সেই ভাষার মানুষদের অধিকার তর্কের মুখে পড়ে। স্বাধীনতার চেতনার ক্রমবিকাশ আরো উদার, গণতান্ত্রিক, সামূহিকতার দিকে সম্প্রসারিত হবে এই রকম বিশ্বাস যে সবসময় কুসুমাস্তীর্ণ পথে নির্বিবাদে অগ্রগামী হয় তা নয়। ইতিহাসের দিকে তাকালে এই উপমহাদেশের ভাষা-দ্বন্দ্বের ইতিহাস অনেকগুলি মৌলিক প্রশ্নের উপস্থাপন করে এবং গণতন্ত্রকে তার্কিক পথে পরিব্যাপ্ত হওয়ার রসদ যোগায়। বাংলা ভাষা-দ্বন্দ্বের তাৎপর্য সারা ভারতের প্রেক্ষাপটে উল্লেখযোগ্য। দীর্ঘকালব্যাপী মানভূমের ভাষা আন্দোলন (১৯৪৮-১৯৫৬) এবং আসামের একাধিক আন্দোলন (১৯৬১, ১৯৭২ ও ১৯৮৬) এপ্রসঙ্গে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশের ২১-এর বিশেষ তাৎপর্য এই যে, সেই আন্দোলন একটা দাবি আদায়ের চরম সমাধান আনতে পেরেছে। ভারতের ভাষা-আন্দোলনগুলির সফলতাও অনস্বীকার্য, তবে চরম সাফল্য তার এখনো আসেনি একথা বলা যেতে পারে। হয়তো তার কারণ, এক অঞ্চলের ভাষা আন্দোলনগুলির সঙ্গে অন্য অঞ্চলের ভাষা আন্দোলনের সংযোগ নেই, আবার পরস্পরের ইস্যুও বাহ্যিকভাবে সবসময় একও নয়; স্থানীয় রাজনৈতিক সমীকরণ আন্দোলনগুলির অভিমুখ কখনো কখনো বদলে দিয়েছে; কখনো ভাষা-দাবি পরস্পর নৃতাত্ত্বিক বা আঞ্চলিক গোষ্ঠী-বিরোধিতায় রূপান্তরিত হয়েছে। তাই ভারতের ভাষা আন্দোলনগুলির লড়াই আরও বৃহত্তর সাফল্যের জন্য, একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক দেশে সব ভাষার প্রকৃত অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আরো পথ হাঁটা বাকি। আর এই দাবি যদি বিফল হয় তাহলে অন্নদাশঙ্কর রায়ের সেই ভবিষ্যৎবাণী বোধহয় ব্যর্থ হবে না –'ভারত যদি ছত্রভঙ্গ হয় ভাষার ইস্যুতেই হবে।'

আসামে ১৯৬১-র ভাষা আন্দোলন ছিল বাংলা ভাষার সঙ্গে সঙ্গে মিজো খাসি বোড়ো মণিপুরি ভাষারও সহযোগিতা। আসামের থেকে কিছু রাজ্য নিজেদের সরিয়ে নিয়ে স্বতন্ত্র রাজ্যের স্বীকৃতি আদায় করেছে, সেখানে ছিল এই ভাষাপ্রশ্নের ঈষৎ ইন্ধনও। আন্দোলন যত দীর্ঘ হয় তার মধ্যে প্রশ্ন-প্রতিপ্রশ্ন, যুক্তি-প্রতিযুক্তির, সাফল্য-ব্যর্থতার আঙুল গোনা চলতে থাকে। রাষ্ট্র বা বিরোধী ক্ষমতা গ্রাস করে নিতে চায় আন্দোলনের তীব্রতা, বা উদাসীনতায় লঘু করে দিতে চায় সময়ের দীর্ঘতায়, বা অপেক্ষায় থাকে নেতৃত্বের দুর্বলতার, বা ক্রমশ সামষ্টিক বিস্মৃতির। আর এই ম্লানতার বিরুদ্ধে তীব্র নির্বিকল্প উজ্জীবক হল তথ্যনিষ্ঠ সমাজ-ইতিহাসচর্চা। সেই ইতিহাসচর্চার কাজটি আরো একবার সামনে এলো দিলীপকান্তি লস্করের 'শহিদতীর্থ বরাক' বইটির কারণে।

১৯ মে শুধু একটি আন্দোলন নয়, আন্দোলন-পরম্পরার জন্ম দিয়েছে। পর পর আরো তিনবার রক্ত ঝরেছে মোটামুটি দশ দশ বছরের ব্যবধানে। আসাম ভারতের মধ্যে একটি বিশেষ রাজনৈতিক প্রশ্নে বারবার বিতর্কের কেন্দ্রে এসেছে সেটি হল বিদেশি-খিলঞ্জিয়া প্রশ্ন। কারা প্রকৃত নাগরিক এই নিয়ে দীর্ঘ রাজনৈতিক টানাপড়েন চলেছে, বাঙালির উপর আক্রমণও এসেছে বারবার। আসামের বরাক উপত্যকায় বাংলা ভাষার অধিকার নিয়ে গণতান্ত্রিক প্রবাহমান আন্দোলন ভারতের ভাষাসমস্যা ও তার ভবিষ্যৎ এর প্রশ্নে তাৎপর্যপূর্ণ অবদান রেখেছে। দীর্ঘদিন ধরে দিলীপকান্তি লস্কর তাঁর 'লালন মঞ্চ' পত্রিকায় ভাষাআন্দোলন নিয়ে গবেষণামূলক কাজ করে চলেছেন। ভাষা-শহিদদের অনেকে অজানা তথ্য তিনি প্রথম উদ্ধার করেছন, তথ্যভ্রান্তিও তিনি নিরসন করেছেন। তাঁর একটি গভীর বেদনা আছে - আসামের বাঙালির কথা আসামের বাইরের মানুষ খোঁজ রাখেন না। এমন কী আসামে যে প্রায় তিরিশ শতাংশ (২৮.৯২%) মানুষ বাংলাভাষী, ভারতের মধ্যে তৃতীয় বৃহত্তম বাংলাভাষী রাজ্য আসাম - তা সহজেই ভুলে থাকা হয়। এই বেদনা থেকেই একটি স্মৃতিধারণযোগ্য কবিতা লিখেছিলেন তিনি। সেই কবিতার আবেগের সঙ্গে মেলালে বোঝা যায় এই গ্রন্থরচনার প্রেরণা তাঁর সত্তার অন্তস্তল থেকে উৎসারিত; ভারতীয় বাঙালি হিসাবে অস্তিত্ব-অনস্তিত্বের প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত। তিনি শুধু বাংলাভাষাশহিদদের কথা বলেননি, বলেছেন মণিপুরি ভাষাশহিদদের কথাও। ব্যক্তি ধরে ধরে তাদের বিস্তৃত পরিবার-পরিচিতি বংশলতিকা ও ছবিসহ উপস্থাপন করেছেন। শুধু বাংলাভাষী হওয়ার সূত্রে যাদের নানান কারণে নিহত হয়েছেন এমন অন্তত এক'শ তিরিশ জন মানুষের তালিকা দিয়েছেন বিশিষ্ট লেখক দিগন্ত শর্মা ও দেবব্রত শর্মার বই-এর সূত্র থেকে। ১৯মে-র ঐতিহাসিক সামাজিক পটভূমিকা, সংগ্রাম আর তার মূল্যায়ন করেছেন। যোগ করেছেন ভাষা আন্দোলন বিষয়ক বহু গ্রন্থের নাম, ছবি; ১৯মে পুলিশের গুলি চালনার রিপোর্ট, এনসি চ্যাটার্জি কমিশনের রিপোর্ট, মেহরোত্র কমিশনের সাক্ষীদের বয়ান। যে ইতিহাস একটা দীর্ঘমেয়দি সংগ্রামকে সজীব ও সজাগ রাখে সেরকমই একটি দায়বদ্ধ সমাজচর্চার নিদর্শন হিসাবে উল্লেখ করা যায় এই বইটিকে।

ইতিমধ্যে বিশিষ্টজনের প্রশংসা পেয়েছে এই বই। অধ্যাপক উষারঞ্জন ভট্টাচার্য বলেছেন –"ইতিহাসের কাঁটাকুঞ্জ থেকে জন্ম নিয়েছে সুসংহত ইতিহাস গ্রন্থ 'শহিদতীর্থ বরাক'। ছোট্ট আধারে এক আকাশ বেদনাগাথা।" এই বইটি শুধু বাঙালি হিসাবে নয় সমস্ত ভাষাগণতন্ত্রসচেতন মানুষের সংগ্রহে তথ্যের আকর হিসাবে থাকা আবশ্যক। শেষে এইটুকুই শুধু বলার যে, হয়তো কোথাও কোথাও ভাষায় লেখকের ব্যক্তি আবেগ ঈষৎ উচ্চগ্রামে উঠেছে। কিন্তু পাঠক হিসাবে একথা যেন মনে রাখি - একটি ভাষার প্রতি প্রেম মানে অন্য ভাষার প্রতি দ্বেষ নয়। প্রতিরোধ যেন কোনো মৌলবাদী চিন্তায় আক্রান্ত না হয়ে যায়। যুদ্ধটা কোনো বিশেষ ভাষার বিরুদ্ধে নয় বরং সব ধরনের আগ্রাসী চেতনার বিরুদ্ধে। এই বই-এর সেই উদ্দেশ্য সফল হোক।