বদ্ধোহস্মি  | বইয়ের প্রচ্ছদ
বদ্ধোহস্মি লেখক রামচন্দ্র প্রামানিক প্রকাশক ঋতাক্ষর প্রকাশিত ২০১৫
দেবল | বইয়ের প্রচ্ছদ
দেবল লেখক রামচন্দ্র প্রামানিক প্রকাশক ঋতাক্ষর প্রকাশিত ২০১৮
কালপক্ব | বইয়ের প্রচ্ছদ
কালপক্ব লেখক রামচন্দ্র প্রামানিক প্রকাশক ঋতাক্ষর প্রকাশিত ২০২১
তুঘলক | বইয়ের প্রচ্ছদ
তুঘলক লেখক রামচন্দ্র প্রামানিক প্রকাশক ঋতাক্ষর প্রকাশিত ২০১৬

জীবন বড় অনিশ্চিত। তার বাঁকে বাঁকে রাখা থাকে অভাবনীয়, যার হদিশ এক মুহূর্ত আগেও জানা থাকে না। নইলে একজন প্রতিষ্ঠিত লেখক, ‘উশ্রী পারে রাত্রি’-র মতো কবিতার বই লিখে আলোড়ন ফেলা এক কবি সাহিত্য জগত থেকে দীর্ঘ পঁচিশ বছরের স্বেচ্ছা নির্বাসন নেবেন কেন? আর সেখান থেকে ফিরে আসার পরে তিনি এমন ভাবে শুরু করলেন যেন কোথাও যাননি। বিগত দশ বছরে কবিতা গল্প প্রবন্ধ স্মৃতিকথা আর নাটক, হ্যাঁ নাটক লিখে চলেছেন অবিশ্রান্ত। এই নাটক লেখাটি বড় বিস্ময়কর। বাংলায় মৌলিক নাটক লেখার ধারাটি বিশেষ পুষ্ট নয়, কখনো কোন লেখক তাঁর বুধগোষ্ঠীর অভিনয়ের দাবীতে নাটক লিখে থাকেন। যেমন বুধসন্ধ্যার জন্যে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় লিখতেন। কিন্তু রামচন্দ্র প্রামাণিকের ক্ষেত্রে তেমন কোন তাগিদ ছিল বলে আমার অন্তত জানা নেই, কিন্তু ২০১৫, ২০১৬ ২০১৮ এবং ২০২১- এই চার বছরে ধারাবাহিক ভাবেই তিনি লিখেছেন চার চারটি নাটক। এবং কী তাদের বিষয়? চারটি নাটকের প্রথমটি রামায়ণ, পরের দুটি মধ্যযুগের সুলতানশাহী, এবং একদম সাম্প্রতিক নাটকটি মহাভারত নিয়ে। অর্থাৎ, একজন কবি ও গল্পকার, যার কাছে কোন নাট্যগোষ্ঠীর কোন দাবী নেই, তিনি যখন এত ধারাবাহিক ভাবে, বিশেষ কিছু বিষয়ের ওপর নাটক লিখে চলেন, তখন বোঝা যায় এর পেছনে তাঁর নিশ্চয় কোন পরিকল্পনা এবং প্রণোদনা আছে।

কী সেই প্রণোদনা? নাটকগুলি পাঠ করলে তা যেন আমাদের সামনে এসে দাঁড়ায়। মহাকাব্যের কাহিনির অংশ বা জনশ্রুতি, মধ্যযুগের রক্তাক্ত ইতিহাসে- এসব আশ্রয় করে আসলে তিনি আলো ফেলতে চান মানব সভ্যতার ইতিহাসের জটিল গতি প্রকৃতি, রাষ্ট্রের নির্মমতা, যুদ্ধ আর যুদ্ধের অবশ্যম্ভাবী শূন্যতার ওপর। শাসকের নিষ্পেষণে সাধারণ মানুষের নিয়তির বদল তিনি দেখতে চান এক আধুনিক মানুষের দৃষ্টিতে। গ্রীক ট্র্যাজেডির নিয়তি তাড়িত সত্ত্বার স্থান, কাল, ঘটনা সম্বন্ধীয় ত্রিবৃত্তীয় সংহতি, অবলম্বন করে তিনি প্রশ্ন করেছেন মানুষের মূল্যবোধকে, বিবেককে, যার বিসর্জনের ওপরেই জাগতিক উন্নতি নির্ভর করে।প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন এই সময়কে, যা প্রকৃতপক্ষে অতীতেরই পুনারাবৃত্তি করছে। আসলে নতুন কিছুই ঘটছে না এই পৃথিবীতে। মানুষের আদিম প্রবৃত্তি একই আছে, তাই ঘটনাগুলিও কাল কালে একই আছে।

বদ্ধোহস্মি

বদ্ধোহস্মি নাটকটি ধরেই শুরু করা যাক। দশরথের জীবনের শেষ কয়েকটি প্রহর এই নাটকের সময়কাল। রামচন্দ্র বনে চলে গিয়েছেন। তাঁর বিচ্ছেদবেদনায় অযোধ্যা যেন মৃত নগরী। ‘রাজপথে জন কোলাহল নেই, কৌতুক হাস্য নেই, গীতবাদ্য নেই। চারদিকে শ্মশানের স্তব্ধতা’

শোকার্ত রাজা বহুবছর পরে এসেছেন রানি কৌশল্যার ঘরে। কৌশল্যা তাঁকে বিদ্ধ করছেন অভিযোগে, বিদ্রূপে। কীভাবে কৈকেয়ীর দাবী মেনে নিয়ে এত বড় অধর্ম রাজা করতে পারলেন, সেই নিয়ে কৌশল্যার ক্ষোভ কিছুতেই প্রশমিত হচ্ছে না। কথা বলতে বলতে কৌশল্যা আচমকা উন্মোচন করছেন রাজা দশরথের অতীতের এক ভয়ানক পাপ। প্রথম সন্তান শান্তাকে তার মার অনুমতি না নিয়েই অঙ্গরাজকে দিয়ে দিয়েছিলেন দশরথ তাঁর রাজনৈতিক সুবিধার জন্য।
মাতার সম্মতি নিতে হবে? এ কথা শুনে অবাক দশরথ বলেন ‘পতির সম্মতিতে কি মিশে থাকে না পতিব্রতারও সম্মতি?’

কৌশল্যা- তা-ই তোমরা ধরে নাও। ওটিই তোমাদের সুবিধে। যদিও সে প্রশ্নের যথাযথ উত্তর দিতে পারে শুধু সেই পতিব্রতাই। কিন্তু কে তার মন জানতে চাইবে? অতি সামান্যা সেই রমণীর?

রামায়ণের কাহিনীর ‘ইন বিটুইন দা লাইনস’ থেকে নাট্যকার তুলে এনেছেন এক আশ্চর্য প্রতিবাদী কৌশল্যাকে। তাঁর ক্রমাগত প্রশ্নের সামনে অরক্ষিত দশরথ একসময় স্বীকার করে ফেলেন তাঁর আরও মারাত্মক এক পাপের কথা। শব্দবেধী বাণ ছুঁড়ে পশু মারতে গিয়ে তিনি খুন করেছিলেন বৃদ্ধ অথর্ব বাবা মা-র একমাত্র অবলম্বন তরুণ ঋষিকুমারকে। সেই অভিশাপেই কি পুত্রহীন হতে হল তাঁকে? জীবনের এত বড় বিপর্যয়ের সামনে দশরথ উপলব্ধি করেন ‘অনেকটা সময়ের বড় প্রেক্ষাপটে দেখলে বহু কিছুর চেহারা এবং অর্থ বদলে যায়। তখন বোঝা যায় আজ যাকে গৌরবের ভাবছ তা সত্যি গৌরবের না-ও হতে পারে। আবার যাকে অমঙ্গলের এবং অগৌরবের মনে হচ্ছে তা হয়তো সত্যিই তেমন নয়। আর তখনই তুমি বুঝতে পারবে আমরা সত্যিই কত কম জানি, আমাদের দৃষ্টি কত সীমিত’
কৌশল্যা, সুমিত্রা নিদ্রামগ্ন, সবার অজান্তে চলে গেলেন ইক্ষাকু বংশের পরম প্রতাপশালী রাজা দশরথ। কেউ গালে গঙ্গাজল দেয়নি, কেউ পরম ব্রহ্মের নাম শোনায়নি, কেউ জানতে চায়নি তাঁর অন্তিম ইচ্ছের কথা। সারাজীবনের সমস্ত কীর্তি একটিমাত্র কাজের জন্য মুছে গেল, বড় অগৌরবে, বড় অসম্মানে বিদায় নিলেন দশরথ।

‘মৃত্যু মহাতামস সাধক। নিজেকে কোন সৌভাগ্যশালী যেন সুখী না ভাবে। শুধু মৃত্যুর দিনেই জেনে যাবে তুমি সুখী ছিলে কি না’

তুঘলক

দিল্লি শহরে আরব পর্যটক ইবন বতুতার বাসগৃহ এবং সম্মুখের রাস্তা। মুহম্মদ বিন তুঘলকের রাজত্বে, অপরাহ্নবেলার একটি দিন, সকাল থেকে শুরু হয়ে বিস্তৃত রাত্রিকালীন ঈশার নমাজের আজান পর্যন্ত। এই তুঘলক যিনি একদিকে দরাজ দিল, মেধাবী, ন্যায়বিচারে সেরা, কোনরকম নেশা, ব্যভিচার জুয়া খেলা- এরকম কোন কু অভ্যাস কিছুই নেই তাঁর, তিনিই আবার এমন কুচক্রী যে প্রাসাদ ধ্বংস করিয়ে পিতাকে হত্যা করে সিংহাসন দখল করেন, এতই নিষ্ঠুর, যে গায়ের চামড়া ছাড়িয়ে নেন বিদ্রোহীর, তার মাংস দিয়ে বিরিয়ানি রান্না করে পাঠান তার স্ত্রী পুত্রের কাছে, ( এই একুশ শতকেও কুলতলিতে ছেলের রক্তমাখা ভাত খেতে বাধ্য করা হয়েছিল মাকে- এ ঘটনা আমাদের মনে না পড়ে পারে না) তাঁর খামখেয়ালের দাম দিতে লক্ষ লক্ষ লোক দিল্লি থেকে দৌলতাবাদের রাস্তায় পড়ে মারা যায়। ভাবতে বিস্ময় জাগে ইন্টারনেটের কত শতক আগে তুঘলক কি নিখুঁত গুপ্তচর ভিত্তিক তথ্যব্যবস্থা গড়ে তুলেছিলেন, যেখানে স্ত্রীর দেওয়া সুলতানের মাথার দিব্যি ভেঙে স্ত্রীর সঙ্গে জোর করে মিলিত হচ্ছেন গৃহস্থ- এমন খবরও চলে যেত সুলতানের কাছে , যার জেরে গৃহস্থকে কোতল করা যেত। তুঘলক ধূর্তামিতে শৃগাল, ক্ষিপ্রতায় চিতা, বিষে সাপ। সত্যি আর মিথ্যের মিশেলে তৈরি বিশাল এক ধাঁধা বসে আছে সবার মাথার ওপরে। এও যেন জালের আড়ালে থাকা রক্তকরবীর রাজা।

‘কানা ল্যাংড়াদেরও টেনে হিঁচড়ে নিয়ে গিয়েছিল, ... বুড়ো বাপ ওই রাস্তাতেই গেলেন’
মধ্যযুগের এই ঘটনা কখন যেন আমাদের সমকালে এনে দাঁড় করায়। হঠাৎ লকডাউনের ফলে সারা দেশ জুড়ে হেঁটে চলা পরিযায়ী শ্রমিকের স্রোত, রেললাইনে রক্তমাখা রুটি, জামলো মখদম আমাদের সামনে এসে দাঁড়ায়। তুঘলক মৃত, কিন্তু তুঘলকির মৃত্যু নেই। শাসকের বেশ পালটায় শুধু। আর রাষ্ট্রের পিলসুজের নিচে আলো ধরে থাকে যারা, সেই প্রান্তিক শ্রমিকের দল, সে হোক মুসলিম কাসেম কি বুজরুক, কিংবা হিন্দু রতন- সব শাসকের আমলেই তাদের অবস্থা এক থাকে। ‘কেউ আমরা আজাদ নই। পুরো মানুষও নই। ভাঙ্গাচোরা আমরা-কেউ আধখানা, কেউ সিকিখানা।’ আর এদের থেকেও নেই মানুষ হল গোলাম অর্থাৎ ক্রীতদাস। যাদের কোন পরিচয় হয় না। ‘গোলামের বাপ খিদে, মা তেষ্টা, গাঁয়ের নাম ভয়’ আর গোলামদের থেকেও নিচের স্তরে থাকে বাঁদীর দল। ‘বাঁদী হবে উটের মতো। কাঁটাগাছও চিবিয়ে খাবে, শীত-গ্রীষ্ম মানবে না, বোঝা বইবে মুখ বুজে, দুধ দেবে গামলা ভরে, মাংস দেবে খাওয়ার জন্য’ এইরকম এক বাঁদী, ইবন বতুতার পরিচারিকা সালিহা। মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে ইবন বতুতা তাকে আজাদ করে দিয়ে গেলেন। যখন এক আগন্তুক এসে তুঘলকের প্রশংসায় পঞ্চমুখ, তখনই ইবন বতুতাকে কোতল করার আগাম সংবাদ এসে পৌঁছয়। তাঁর অপরাধ? তিনি তুঘলকের দু চক্ষের বিষ দরবেশ শেখ শিহাব উদ দীনের মুরিদ।
ইবন বতুতা হয়তো এবারের মতো সুলতানের খামখেয়ালিপনার হাত এড়িয়ে প্রাণে বাঁচলেন, কিন্তু তাঁর জীবন প্রাপ্তি মানে তো সালিহার আজাদি বরবাদ, দেশে ফেরাও মুলতুবি। এভাবেই তুঘলক শুধু প্রজার ওপর নেমে আসা রাজার অত্যাচারের একমাত্রিক নাটক থাকে না, তা হয়ে ওঠে সুবিধাভোগী শ্রেণীর জটিল ও বহুস্তরিক আঁতকে ওঠা শোষণের নাট্যরূপ। দেশকাল ছাড়িয়ে হয়ে ওঠে সমকালেরও দর্পণ।

দেবল

মধ্যযুগের সুলতানশাহি নিয়ে আরেকটি নাটক দেবল। এর সময়সীমাও কয়েক ঘণ্টা মাত্র। রাত্রির প্রথম প্রহর থেকে প্রত্যুষে ফজরের আজান পর্যন্ত। দিল্লি সুলতান মোবারক শাহের হারেম আর শাহী বেগম দেবল দেবীর ভাগ্যবিড়ম্বিত জীবন অবলম্বন করে যা হয়ে ওঠে সংবেদনশীল, হিংসাবিমুখ মানুষের জীবনের অনিশ্চয়তা, অর্থহীনতা, সৃষ্টির অভিপ্রায় এবং অভিমুখ নিয়ে।নাটকটি তার চরিত্র সমাবেশের রহস্যময়তা আর বর্ণিলতায় আমাদের একেবারে হতচকিত করে দেয়। সুলতান আলাউদ্দিন খিলজির মৃত্যুর পর তার বড় ছেলে খিজিরকে বঞ্চিত করে মসনদে বসানো হল ছ বছরের শিশু শিহাবুদ্দিনকে। এই চক্রান্তের চক্রী মালিক কাফুর। খিজির কবি এবং বিষয় বাসনাহীন। সুখের পায়রা বন্ধুদের প্রসঙ্গে তিনি হাসতে হাসতে বলতে পারেন শের-
‘যে আমার বন্ধু নয়, আল্লা
যেন তার বন্ধু হন।
যে আমাকে দুঃখ দেয়, তার সুখ
যেন বেড়ে চলে।’
এই খিজিরের চোখ উপড়ে নেওয়া হল।
তখন খিজিরের একমাত্র সঙ্গী তাঁর স্ত্রী দেবল। যার অপরূপ মুখের ওপর হাত বুলিয়ে তিনি আবৃত্তি করতেন-
‘তোমার চাঁদ মুখ থেকে যদি
হিজাব সরিয়েও ফেল,
কোথায় সেই চোখ যা
তোমার সৌন্দর্য দেখবে?’
গোয়ালিয়রের দুর্গে বড় সুখে ছিল দেবল তার অন্ধ স্বামী খিজিরকে নিয়ে। করণ রায় আর কমল দেবীর মেয়ে দেবল, সে খিজিরকে শোনাত কালিদাস, খিজির তাকে শোনাত ফার্সি কবিতা। বাইরের চোখ গিয়ে অন্তরের চোখ খুলে গিয়েছিল তার। কিন্তু মোবারক পয়গাম পাঠাল, দেবলকে সে চায়, অন্ধ খিজির এত রূপ নিয়ে কী করবে? সে তো দেখতেই পাবে না। শেষ অব্দি খিজিরকে মেরে সে দখল করল দেবলকে। যদিও মোবারকের আসক্তি পুরুষমানুষে, তাঁর পেয়ারের পুরুষ খসরু খান, তার মন পেতে সে দরবারেও মেয়েদের পোশাক আর গয়না পরে যায়।
কিন্তু সুলতানিতে চক্রান্ত আর রক্তপাতের শেষ নেই। মোবারক শাকে খুন করে মসনদের দাবীদার তার সেই পুরুষ আশিক খসরু, যে নাকি আদতে কাফের, দেবলের মতো তারও মাতৃভাষা গুজরাটি। সে এবার দখল করতে চায় দেবলকে। গুজরাটের রাজকুমারী, খিজির খানের আশিক, কবি আমির খসরুর নায়িকা, সুলতান মোবারক শাহ্‌র বেগম দেবল বুঝতে পারে না কী হচ্ছে। ‘সবাই বলছে মোবারক শাহকে কোতল করেছে। তাঁর ধড় ওপর থেকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে চবুতরায়। যে মরেছে সে আমার স্বামী, যে মরেছে সে স্বামী হন্তা। আমি কি বুক চাপড়ে কাঁদব, না উল্লাসে নৃত্য করব?’ দেবল শিউরে উঠে ভাবে এই শিশুঘাতী সন্তানঘাতীর বিছানায় উঠতে হবে তাকে? তার বোন বিমল, যে আর দেবল একই পিতার কন্যা, কিন্তু বিমলের মা দাসী, তাই দুই বোনের ভাগ্য দুই খাতে বয়েছে, সে কী অসাধারণ কথা বলে ‘একবার শয্যায় উঠলে বিরাগ-বিতৃষ্ণা চলে যাবে। তীব্রভাবে সাড়া দেবে তোমার বিমুখ শরীর। শরীরকে এমনই নির্বোধ করে তৈরি করেছেন ঈশ্বর’
বিমল দাসীকন্যা বলেই দুনিয়াদারির জ্ঞান তার অনেক বেশি। মধ্যযুগে দাঁড়িয়ে সে যা উচ্চারণ করে, তা তো এখনকার নারীবাদী ভাষ্য। বিমল প্রশ্ন করে ‘ব্যভিচারের জন্য মেয়েমানুষটির দায় কি পুরুষটির থেকে বেশি? শাস্তি নিয়ে সে যদি মরবে তবে কেন বেঁচে থাকবে ওই মানুষটি?’
সে প্রশ্ন করে ‘পরস্ত্রীগমন যদি ব্যভিচার হয়, তাহলে সুলতান আলাউদ্দিন নিজে যখন পরস্ত্রীকে হারেমে ঢুকিয়েছেন, তখন তা কি ব্যাভিচার হয়নি? না কি পরস্ত্রীগামী যদি হয় যুদ্ধজয়ী শক্তিমান, তবে তা হয়ে যায় ব্যভিচারের উল্টোটা?’
সে এমনকি প্রশ্ন করতে পারে নিজের পিতাকে নিয়েও ‘ সম্মান বাঁচানোর জন্য যদি জহরব্রতের নিয়ম থাকে, রাজা করণ রায় কেন ওই একই নিয়মে আগুনে ঝাঁপ দিয়ে মরলেন না? সম্মান রক্ষার দায় কি কেবল অবলা মেয়েদের?’
বিমল খবর রাখে কুমারী দাসীর মূল্য বিশ থেকে ত্রিশ তঙ্কা। পাঁচটি অপরূপ সুন্দরী খানদানি ঘরের কুমারীর মূল্য ছিল একটা গোলামের সমান।
শেষ পর্যন্ত এ নাটক এমন কিছু অনিশ্চিতের যা মানুষের হাতে নেই। জন্ম, রাজনৈতিক অস্থিরতা- এসব মুহূর্তে পালটে দেয় মানুষের নিয়তি। আর গ্রীক ট্র্যাজেডির অন্ধকার ঘনিয়ে আসে আমাদের চারপাশে।

কালপক্ব

একদম শেষ নাটক কালপক্ব। মহাভারতের শেষ দিনটি নিয়ে। রামায়ণের সময়কালের থেকে মহাভারত অনেকটা এগিয়ে। পৃথিবী এখন প্রাচীনা হয়েছেন।রামায়ণের সমাজের থেকে মহাভারতের সমাজ অনেক বেশি জটিল এবং নগরমুখী। রামায়ণের অরণ্যভাবনা থেকেও কি অনেকখানি সরে আসেনি মহাভারত? এখানে তো খাণ্ডবদহন পর্বেই বন কেটে নগরায়নের যুগলক্ষণ স্পষ্ট। জমি নিয়ে সংঘাত পৌঁছে যায় ভ্রাতৃঘাতী সংঘর্ষে, যা আসলে পৃথিবীর প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, যাতে জড়িয়ে পড়ে প্রায় সবাই। এ এমন এক যুদ্ধ, যাতে পক্ষ বা বিপক্ষ- যেকোন একটা বেছে নিতে হবে, ঠিক আজকের পোলারাইজড পৃথিবীর মতো। কিন্তু বেদব্যাস যাদের কথা লেখেননি, ইতিহাস যাদের পাশ কাটিয়ে গেছে, সেইসব মানুষ কীভাবে দেখেছিল এই যুদ্ধকে? এই বিপুল মিডিয়াপুষ্ট যুদ্ধ আদৌ কি ছাপ ফেলেছিল তাদের জীবনে? ভয়ানক সব মারণাস্ত্রের ফলে বাতাস বিষাক্ত হয়েছিল, অজন্মা হয়ে গেছিল আশপাশের উর্বর জমি- এইটুকু ছাড়া কৌরব বা পাণ্ডব – কে বিজিত আর কে বিজয়ী- তাতে তাদের কী-ই বা এসে যায়? এই সব প্রশ্ন উঠে এসেছে কালপক্ব নাটকে। যুদ্ধের অষ্টাদশদিনের অপরাহ্নে যুদ্ধস্থলের কাছের জঙ্গলে এক বনবাসীর কুটিরে শুরু হচ্ছে এই নাটক, আর শেষ হচ্ছে রাত্রিশেষে, যখন কৃষ্ণ, সাত্যকি এবং পঞ্চপাণ্ডব বাদে বিজয়ীপক্ষের শেষ যোদ্ধাটিও নিহত।মূলধারার বীরেরা নয়, রণভূমি ছেড়ে পালানো সারথি, ভাগ্যানবেষী ব্রাহ্মণ আর অনার্য আদিবাসীর মতো প্রান্তজনেরাই এই নাটকের কুশীলব, যাদের মধ্যে দিয়ে নাট্যকার আসলে ছুঁতে চেয়েছেন সেই সময়ের প্রকৃত যুদ্ধকে যা প্রতিদিন লড়ে এই সব প্রান্তজনেরা নিজেদের ভাগ্যের বিরুদ্ধে, সমাজের বৈষম্যের বিরুদ্ধে, তারাই প্রকৃত বীর, যাদের তুলনায় কত ক্ষুদ্র আর অকিঞ্চিৎকর গদা আর নারাচ হাতে যুদ্ধরত বীরেদের ঢক্কানিনাদ। তারাই উদ্ঘাটিত করে প্রকৃত সত্য। বৃদ্ধ নিষাদ শরভই তো প্রকৃত প্রাজ্ঞ, কারণ সে দেওয়াল লিখন পড়তে পারে। সৌপ্তিক পর্বে দ্রৌপদীর পাঁচ পুত্রের মর্মান্তিক নিধনের পেছনে সে দেখে খাণ্ডবদহনের পাপ।
‘দেখতে কি পাচ্ছ কোনও মিল? খাণ্ডব বনে প্রাণে বেঁচেছিল মাত্র সাতটি প্রাণী। এখানেও বাঁচল এই সাতজন মাত্র। শোন হে তোমরা, শোন, সমস্ত দেনাই শোধ করতে হয়। কাল রেহাই দেয় না কাউকে’
‘কাল ভোলে না কিছুই। মানময়ী পত্নীর মতো সব জমিয়ে রাখে অন্দরে, আপ্তকালে যা বেরিয়ে আসবে অব্যর্থ আয়ুধের মতো’
মহাযুদ্ধে জয় তাহলে কাদের হল? এত বিপুল সেনা সমাবেশ, এত অস্ত্রের ঝনঝনি- তার ফল শেষ পর্যন্ত কী?
‘রাজারা নিহত হয়েছেন, যোদ্ধারা গতায়ু ও নিষ্প্রাণ, সুজলা সুফলা শ্রীভূমি শবে রক্তে পুরীষে বসায় বিনষ্ট। অনাথা এই পৃথিবী তাহলে কার মুখের দিকে তাকিয়ে? হতপুত্র নির্বান্ধব সহায়হীন স্থবির যুধিষ্ঠিরের জন্য রাজ্য আর কোন কাজে লাগবে?’
তবে কি কিছুই ছিল না আশা করার মতো? ছিল তো, ওই যে নিম্নবর্গের জাগরণ, ওই যে উপলব্ধি, যুদ্ধ আমাদের আসলে কিছুই দেয় না, কাল সব হরণ করে, মিথ্যে অহংকার, শূন্যগর্ভ বীরত্বের আস্ফালন- সব। হায়! আমরা যদি মনে রাখতে পারতাম!
প্রতিটি শিল্প মাধ্যমের মতো, নাটকেরও আছে আলাদা ভাষা। সাহিত্যের ভাষা আর নাটকের ভাষা আলাদা। দৃশ্যের পর দৃশ্য জুড়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে, শেষে চরম ক্লাইম্যাক্স তৈরির দায় যেমন থাকে নাট্যকারের, তেমনই দৃশ্যশ্রাব্য মাধ্যমে শরীরী অভিব্যক্তি এবং বাচনিক প্রকাশের সুযোগ থাকে বলেই নাটকের সংলাপকে অতিরেক বর্জিত, অথচ মোক্ষম হতে হয়। যিনি সাহিত্যজীবনের পরিণত বয়সে এসে প্রথম নাটক লেখায় হাত দিলেন, তিনি এইসব আয়ত্ত করেই এসেছেন। তাই নাটকগুলি পাঠক হিসেবে পড়তে যেমন আকর্ষক লেগেছে, তেমনই মঞ্চস্থ হলেও দর্শকানুকূল্য থেকে বঞ্চিত হবে না বলেই বিশ্বাস। কলকাতা ও মফস্বলের নাট্যদলগুলি, যারা মাঝে মধ্যেই মৌলিক বাংলা নাটক নেই বলে আক্ষেপ করেন, আশা করব তাঁরা অচিরেই এই চারটি নাটক, বিশেষ করে তুঘলক এবং কালপক্বের সন্ধান পাবেন।

চারটি গ্রন্থই সুমুদ্রিত, যার জন্য ঋতাক্ষর প্রকাশন ধন্যবাদার্হ।